
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মতপ্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে কারাগারে যেতে হয়নি বলে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তার এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন আল জাজিরার বাংলাদেশি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
রোববার ১৫ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উপদেষ্টার বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, অন্যায়ভাবে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দিয়ে নিজেদের দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত।
পোস্টে জুলকারনাইন লেখেন, “সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সম্ভবত তার সরকারী কর্মদিবসের শেষ দিন ঘনিয়ে আসার মনোকষ্টে ভুলভাল আলাপ বকছেন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত এক বছরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষের চাপ ও নিপীড়নে দেশে গণতান্ত্রিক পরিসর এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া রহস্যজনক পরিস্থিতিতে চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকারদের মধ্যে ১১৮ জন সরাসরি হামলার মুখে পড়েছেন এবং ২০ জনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদের জেরে অন্তত ১২৩ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জুলকারনাইন দাবি করেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ প্রয়োগ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টকশোতে সরকারের সমালোচনা এবং নিজস্ব মতপ্রকাশের কারণে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, আনিস আলমগীর এবং মনজুরুল আলম পান্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া সাংবাদিক শাকিল আহমেদ, ফারজানা রুপা, মোজাম্মেল বাবু এবং শ্যামল দত্ত একাধিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় ১৬ মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং নিম্ন আদালতে বারবার জামিন আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পোস্টের শেষাংশে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, “বাজে কথা না বলে, নিজেদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অন্যায়ভাবে জেলে আটক এসব সাংবাদিকদের মুক্তি দিয়ে নিজ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুন।”
জুলকারনাইন তার পোস্টে তথ্য উপদেষ্টার বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদপ্রতিবেদের স্ক্রিনশটও সংযুক্ত করেন।
এদিকে তার এই পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছেন। একজন মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সাংবাদিকদের উপর এত অত্যাচার আর কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘মিথ্যাচারের একটা সীমা থাকা উচিত।’ অন্য একজন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দায়মুক্তির অধ্যাদেশের সুবিধা কি উপদেষ্টারাও পাবেন?’
শাকিল আহমেদ, ফরজানা রূপা, শ্যামল দত্ত ও মোজাম্মেল বাবুর প্রসঙ্গ টেনে একজন মন্তব্য করেন, ‘আপনি কি মানুষ না গোল্ড ফিশ? হায় খালেদ!’ আরেকটি মন্তব্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে ‘পলিথিন উপদেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে লেখা হয়, ‘এইসব পলিথিন উপদেষ্টা চোখে দেখে না!’ এছাড়া আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘ক্ষমতা হারানোর কষ্টে ডেমেনশিয়া হয়ে গেছে।’ একজন তাকে ‘রাজাকার কন্যা’ বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্য এক মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘এই রকম মিথ্যাচার কোন রাজনৈতিক সরকারও করেনি।’