
নানা কারণে সংকটে পড়া পাঁচ ইসলামি ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসনিক কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ব্যাংকটির কার্যক্রম গত ১ জানুয়ারি শুরু হলেও এর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয়ে কাঠামোগত আনুষ্ঠানিকতা এখনো শেষ করতে পারেনি। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের লেনদেন চালুর পরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পিছিয়েছে দুইবার।
এদিকে রোববার (২৫ জানুয়ারি) ব্যাংকের আমানতকারীদের ওপর আরোপিত মুনাফার তথাকথিত ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্তকে শরিয়াহবিরোধী, চুক্তিভঙ্গ ও আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণা আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।
ধীরগতিতে এগোচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকটির লেনদেন চালুর প্রায় এক মাস শেষ হয়ে এলেও এখনো প্রধান কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। রোববার (২৫ জানুয়ারি) মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ব্যাংকটির ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ চলছে। তবে এই কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
এ বিষয়ে জানতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাবেক সচিব আইয়ুব মিয়াকে কল দিয়ে পাওয়া যায়নি।
লেনদেন চলছে পাঁচ ব্যাংকে
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শাখাগুলোতে গ্রাহকদের লেনদেন করতে দেখা গেছে। তবে ব্যাংকে গ্রাহকের সংখ্যা খুবই সীমিত। দীর্ঘদিন আটকে থাকা আমানতের টাকা তুলতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন গ্রাহক।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকের লেনদেন স্বাভাবিক আছে। গ্রাহকেরা টাকা জমা দেওয়ার পাশাপাশি আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারছেন।
স্থায়ী আমানতকারীদের বিক্ষোভ
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ওপর আরোপিত তথাকথিত ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্তকে শরিয়াহবিরোধী, চুক্তিভঙ্গ ও আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণা আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল রোববার (২৫ জানুয়ারি) মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছেন অর্ধ-শতাধিক আমানতকারী। এ সময় তারা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফায় কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত বাতিল, সব ধরনের হিসাবের টাকা মুনাফাসহ ফেরত এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম দ্রুত চালুর দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের এক প্রজ্ঞাপনে জানায় যে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। পরে ২১ জানুয়ারি জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করে মাত্র ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার কথা বলা হয়। অথচ ব্যাংকে আমানত রাখা মানে নির্দিষ্ট শর্তে একটি লিখিত ও অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। হঠাৎ করে এই চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করা আইন, নৈতিকতা ও ব্যাংকিং রীতিনীতির সরাসরি লঙ্ঘন বলে দাবি করেন তারা।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ফেনী ব্রাঞ্চের গ্রাহক ইকবাল হোসেন বলেন, গত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ঘোষিত মুনফা গভর্নর হেয়ারকার্টের নামে আমাদের মুনাফা কাটছে। গভর্নর ব্যাংক ডাকাতদের ধরতে ধরতে পারে নাই, তিনি নিজের ব্যর্থতা গ্রাহকদের ওপর চাপাচ্ছেন। আমাদের দাবি হেয়ারকার্টের নামে আমানতকারীদের প্রাপ্য মুনাফা না কেটে লেনদেন স্বাভাবিক করা।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তোপখানা ব্রাঞ্চের গ্রাহক আলাউদ্দিন বলেন, ২০১২ সালে আমি ডিপিএস করেছি। আমার ডিপিএস মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও আমি টাকা পাচ্ছি না। এখন বলছে টাকা কাটবে। আমি তো এ জন্য ডিপিএস করিনি। হাসিনা না কে টাকা পাচার করছে সেটা আমি জানি না।
এক্সিম ব্যাংকের চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ ব্রাঞ্চের গ্রাহক জাকির বলেন, এক্সিম ব্যাংক মার্জার চায়নি। গভর্নর টেনে মার্জার করছে। এখন আমি টাকা তুলতে পারছি না।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চের গ্রাহক মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, আমার এফডিআর-ডিপিএস-এ প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা আছে। আমি এখন চলতে পারছি না। ব্যাংক টাকা দিচ্ছে না।
আরেক আমানতকারী বলেন, আজ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, কাল অন্যকোনো ব্যাংক। এই সিদ্ধান্ত নজির হয়ে গেলে ভবিষ্যতে যেকোনো ব্যাংকের দুর্নীতির দায় সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানো হবে। এতে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে পড়বে।
মুনাফা কর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা যদি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় তখন তো সুদ হয়ে যাবে। এটা কমবে বাড়বে। ব্যাংকের ভলিউম অর্জিত মুনাফার ওপরে ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হয়। আমরা যখন দেখলাম ২০২৪ ও ২০২৫ দুই বছরে কোনো অপারেটিং প্রফিট হয়নি। স্বাভাবিকভাবে ইসলামী শরীয়া মোতাবেক আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়া যাবে না। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আমরা আরোও চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছি, পরে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে। তারপর ৪ শতাংশ মুনাফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এ ব্যাংকগুলোকে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। হেয়ারকাটের কারণে মানুষ অসন্তুষ্ট ছিল। আশা করি এখন তা থাকবে না।
তিনি বলেন, আমানতকারীরাও তো জানে এই দুই বছর ভালো ব্যবসা করেনি, তাদের যে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। জানে বলেই তো বুঝতে হবে বিগত বছরের মতো মুনাফা পাবে না তারা। এ বাস্তবতা তাদের মেনে নিতে হবে।
এফডিয়ারের টাকায় সংসার চালানো গ্রাহকেরা বিপদে
মানববন্ধনে অংশ নেয়া এক নারী আমানতকারী বলেন, এই ব্যাংকে আমার স্বামীর পেনশনের টাকা রাখা ছিল। সেই টাকার মুনাফা দিয়েই আমাদের সংসার চলত। এখন বলা হচ্ছে দুই বছরের মুনাফা কেটে নেয়া হবে। এটা আমাদের সঙ্গে নির্মম আচরণ।
আরিফ হোসেন বলেন, এফডিআর-এর গ্রাহক যদি নিজে অসুস্থ হয়, তবে তাকে টাকা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তার আত্মীয়-স্বজন অসুস্থ হলে তাকে টাকা দেওয়া হবে না। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা আরেকটু ভালো হলে তা করা হবে। সরকার থেকে যে টাকা পেয়েছে পুরোটা তাদেরকে দিয়ে দিলে ব্যাংক কী করে চলবে?
তিনি বলেন, অনেকে পেনসনের টাকা এফডিআর করেছে। তারা মুনাফার টাকায় সংসার চালায়। আমরা চেষ্টা করছি এফডিআর ভাঙাতে না পারলেও তারা যেন মুনাফার টাকা প্রতি মাসে তুলতে পারে, তবে সিদ্ধান্ত হয়নি। বাজার রেটের একটা ব্যাপার আছে। বাজারে যে রেট আছে, ঐ রেটে তো দেওয়া সম্ভব না। একটা কঠিন সময় পার করছে ব্যাংকগুলো।
রেমিট্যান্সের টাকা এফডিআর করেছে ব্যাংক
৫ আগস্টের পরে এ ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স না দিয়ে এফডিআরে রেখে দিয়েছে বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহক। সে টাকাও এখন তুলতে পারছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, এ ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র ৫ আগস্টের পরেই আসতে শুরু করেছে। তখন অনেকে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে, ব্যাংক তা দিতে না পেরে এফডিআরে রেখেছে। তবে এ ব্যাংকগুলোতে যখন থেকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে, তখন থেকেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। রেমিটেন্স আসার পরে গ্রাহক তা উত্তোলন করছেন।
মানববন্ধনে আমানতকারীরা ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফায় আরোপিত হেয়ারকাট বাতিল, সব ধরনের হিসাবের টাকা মুনাফাসহ নগদায়নের সুযোগ দেওয়া, এফডিআর ও ডিপিএস ভাঙার অধিকার নিশ্চিত করা, নতুন ও পুরোনো আমানতকারীদের সমান অধিকার প্রদান, ধাপে ধাপে পুরো আমানত ফেরতের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা এবং আরটিজিএস, ইএফটি, এটিএমসহ সব ধরনের অনলাইন ব্যাংকিং সেবা চালু করা।
উল্লেখ্য, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চারটি ব্যাংকের মালিকানা এস আলম গ্রুপের হাতে ছিল আর একটি ব্যাংকের মালিক ছিলেন নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। এ সময় ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন নামে-বেনামে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন তারা। এর ফলে ভেঙে পড়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত। এসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে আর্থিক ক্ষতি দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরের বেশি সময় ধরে এসব ব্যাংকে তারল্য সহায়তা দিলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
ফলে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫ অনুযায়ী গত ৫ নভেম্বর এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। পরে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে।
সারাদেশে এসব ব্যাংকের ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। একীভূত হওয়ার পর একই এলাকার একাধিক শাখা মিলে একটি বা দুটি করা হবে। ব্যাংকগুলোর পরিচালন খরচ কমাতে এরই মধ্যে কর্মীদের বেতন-ভাতা ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমানতকারীরা মুনাফা চাইলেও গভর্নর বলছেন পুর্বের মুনাফা নয়, তবে চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে মুনাফা দেয়া হবে।