
ইরান যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, প্রত্যেকটি উপসাগরীয় দেশ এই যুদ্ধের ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক, সামরিক এবং নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার কারণে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্ন হয়েছে, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। এবার আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে– এই সংঘাতের বিস্তার লেবাননে নতুন মানবিক সংকট তৈরি করেছে। যেখানে শত শত বাংলাদেশী প্রবাসী এখন কাজ ও আশ্রয় হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় যুদ্ধের প্রভাব তীব্র হয়ে উঠেছে লেবাননে। এর ফলে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে কর্মরত বহু বাংলাদেশী শ্রমিক চাকরি ও থাকার জায়গা হারিয়ে পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। বৃষ্টি ও ঠাণ্ডার মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় খোলা জায়গায় অবস্থান করছেন তাদের অনেকেই, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী রয়েছেন।
অনেকের কর্মস্থল বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে, ফলে বেতনও বকেয়া রয়ে গেছে। কাজ নেই, আয় নেই—তার ওপর প্রতিনিয়ত মিসাইল ও বিমান হামলার আশঙ্কা তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত ঘিরে লেবানন জড়িয়ে পড়ার পর দেশটির লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন সেখানে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী প্রবাসী। বর্তমানে যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশী অবস্থান করছেন, যাদের বড় একটি অংশ দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে কর্মরত ছিলেন—যেখানে এখন ইসরায়েলের হামলা সবচেয়ে বেশি।
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে কয়েক হাজার বাংলাদেশী উত্তরাঞ্চলে চলে গেলেও অনেকেই অর্থ ও থাকার জায়গার অভাবে খোলা মাঠ কিংবা রাস্তায় অবস্থান করছেন। এতে তাদের জীবনের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের সিয়াহ এলাকার আল আসাদ নামের একটি স্থানে আশ্রয় নেওয়া ২৫ জন বাংলাদেশীর একটি দলের সঙ্গে সম্প্রতি যোগাযোগ হয়েছে বণিক বার্তার। এদের অধিকাংশই নারী, সঙ্গে রয়েছেন কয়েকজন পুরুষ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তারা খোলা মাঠে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, শুধু এই দলই নয়—এমন শত শত বাংলাদেশী একই পরিস্থিতিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এই ২৫ জনের মধ্যে রয়েছেন কিশোরগঞ্জের বেদেনা আক্তার, স্বর্ণা আক্তার, শিল্পী, রুবি, মরিয়াম ও তার স্বামী হাবিবুর রহমান, আনোয়ারা ও তার বোন মনোয়ারা, মদিনা; মানিকগঞ্জের নূরজাহান; পাবনার সামিয়া আক্তার; চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলেয়া; ফরিদপুরের মালা; মুন্সিগঞ্জের রুমা; দিনাজপুরের জাকিয়া; কুমিল্লার ওয়াসিম; কিশোরগঞ্জের মোবারক, শামীম ও আশিক; ময়মনসিংহের নাছিমা আক্তার, রূপা এবং নজরুল ইসলাম।
সিয়াহ এলাকায় দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বসবাস করা প্রবাসী রুমা আক্তার বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘এখন আমরা মাঠে থাকি, বাড়িঘরে ঢুকন যায় না, কোনো নিরাপত্তা নাই। কাজকর্ম সবার বন্ধ, একটা মানুষেরও কাজ নাই। খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নাই, এ পর্যন্ত এত যুদ্ধ হইতেছে কেউ খবরও লয় না, কেউ কোনো খাবার দেয় না। একজনের খাওন ১০ জনে খায়, এক বেলা খাইলে দুই বেলা না খাইয়া থাকা লাগে। এ দেশে বৃষ্টি-ঠাণ্ডা। একটা খালি মাঠ আছে, সেই মাঠের ভিতর সবাই মিল্লা বইয়া থাকি। যুদ্ধ শুরু হইলে দৌড়াই, আবার পরিস্থিতি বুঝলে ফিরে আসি। এমনে রাস্তার ভিতরে আপ-ডাউন করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা কইতাছে যুদ্ধ হইলে আপনারা আরেক এলাকায় যান। মানুষের কাছে টাকা পয়সা না থাকলে, কোনো সাহায্য না থাকলে কোন এলাকায় যাইব? ২০২৪ সালের যুদ্ধে আমার হাত ভাইঙ্গা লাইছি। কোনো সাহায্য পাই নাই। নিজে দেনা কইরা এই দেশে অপারেশন করছি।’
বৈরুতের দাহিয়ে এলাকায় কাজ করা কিশোরগঞ্জের বেদেনা আক্তার জানান, যুদ্ধ শুরু হলে তিনি কর্মস্থল ছেড়ে সিয়াহ এলাকায় আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কর্মস্থল ছেড়ে বর্তমানে সিয়াহ এলাকায় এসেছি। এখানে আমরা প্রায় ২৫ জন প্রবাসী আছি। এর মধ্যে কয়েকজন পুরুষও আছে। দিনের বেলায় আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করে রাতে সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়ে খোলা মাঠে বসে থাকি। রোববার (১৫ মার্চ) রাতে যেমন ছিল বোমাবর্ষণ, তেমন ছিল বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা। খুব কষ্ট হচ্ছে এখানে। কিন্তু কোথাও যেতেও পারছি না।’
মানিকগঞ্জের নূরজাহানও একই ধরনের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এখানে কোনো লোকজন নেই। দোকানও বন্ধ। আমরা তিন-চারদিন পর একদিন গোসল করি। খাওয়া-দাওয়াও ঠিক নেই। কষ্ট করে একজনের খাবার কয়েকজনে মিলে খাচ্ছি।’
নিরাপদ এলাকায় না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকা নিরাপদ আছে সেখানে গিয়ে থাকার মতো অবস্থা নেই। কাজ করতে পারছি না। আয়-রোজগারও নেই। এ অবস্থায় সেসব এলাকায় গিয়ে একটা রুম নিয়ে তার ভাড়া দেয়া সম্ভব না। তাই এখানে খোলা মাঠে সবাই মিলে দিন কাটাচ্ছি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এখলাসুর রহমান জানান, বৈরুতের দাহিয়ে এলাকায় হঠাৎ বোমা হামলার পর তিনি কর্মস্থল ছেড়ে স্ত্রী ও নবজাতক সন্তানকে নিয়ে গভীর রাতে পালিয়ে যান। বর্তমানে ২০–২৫ কিলোমিটার দূরে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ে বেতন পাননি; প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার পাওনা আটকে রয়েছে।
অন্যদিকে মাজদা গাড়ি কোম্পানিতে কর্মরত বারেক হাসান বলেন, এখন তিনি গাছের নিচে দিন কাটাচ্ছেন, আর তার স্ত্রী অন্যত্র বাংলাদেশী নারীদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, ‘১৫ দিন ধরে আমি ঘরে ঘুমাইতে পারি না। সিয়াহ এলাকার বাসা থেকে আমাদের বাইর করে দিছে। এখন রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে থাকি। প্রচুর বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা, দুইদিন ধরে মসজিদের ভিতর ঘুমাই। আমার বউ অন্য জায়গায় কয়েকজন বাঙালি মহিলার সঙ্গে থাকে। আমাদের যাওয়ার জায়গা নাই, ঘর ভাড়া অনেক। মিসাইল এক কিলোমিটার দূরে পড়লেও সব কাঁপে।’
এ বিষয়ে বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দা অ্যাফেয়ার্স এআই ও প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গত যুদ্ধের পর থেকেই বাংলাদেশীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রবাসীরা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে আমাদের বেশির ভাগ কর্মী কৃষি খামার এবং বাড়িতে কাজ করেন। আক্রমণগুলো মূলত কয়েকটি শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় যারা প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করতেন তারা এখনো অনেকটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, আমরা তাদের বৈরুতের দিকে নিরাপদ স্থানে চলে আসতে বলছি এবং গাড়ির ব্যবস্থাও করছি। তবে অনেকে আসতে রাজি হচ্ছেন না, তারা পরিচিত পরিবেশে থেকেই পরিস্থিতি দেখতে চাইছেন।’
খাদ্য ও আশ্রয় সংকট প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘লেবাননের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন জায়গায় শেল্টারের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু আমাদের লোকজন সেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে তারা পরিচিত বাংলাদেশী কমিউনিটির কাছাকাছি থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। যখনই আমরা কোথাও খাবার বা অন্য সমস্যার তথ্য পাচ্ছি, মোবাইল টিম পাঠিয়ে খুঁজে খুঁজে তাদের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করছি। স্থানীয় এনজিও এবং লোকাল অথরিটির সঙ্গেও সমন্বয় রাখছি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাস্তাঘাটে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।’