
কয়েক দশক ধরে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নির্ধারণে পর্দার আড়াল থেকে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ‘খ্রিস্টান জায়নবাদ’। বিশেষ করে দেশটির রক্ষণশীল ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান সমাজকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় খুঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই শক্তিশালী ভিত্তিমূলে বড় ধরনের ফাটল ধরার স্পষ্ট আভাস মিলছে। বিভিন্ন সমীক্ষা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্কিন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সেই অন্ধ সমর্থন আর অবশিষ্ট নেই।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, খ্রিস্টান জায়নবাদীদের ধারণা যে যিশু খ্রিস্টের পৃথিবীতে পুনরাগমনের পথ সুগম করতে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের পুনর্বাসন এবং একটি শক্তিশালী ইসরায়েল রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসের ওপর ভর করেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাইবেল বেল্ট’ খ্যাত অঞ্চলগুলোতে ইসরায়েলের পক্ষে এক বিশাল জনমত তৈরি হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম প্রধান ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে।
তবে বর্তমান সময়ের চিত্রটা ভিন্ন। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমাগত রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের প্রশ্নে তরুণদের মনস্তত্ত্বে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের ইভানজেলিক্যালদের মাঝে এই ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক তত্ত্বে বিশ্বাস আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এক দশক আগেও যেখানে সিংহভাগ ইভানজেলিক্যাল এই মতাদর্শকে মনেপ্রাণে ধারণ করতেন, বর্তমানে ৩০ বছর বা তার কম বয়সীদের মধ্যে সেই হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে এই যুবসমাজের একটি বড় অংশ এখন ইসরায়েলকে সরাসরি সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানের তরুণ সমাজ ইসরায়েল রাষ্ট্রটিকে আর কেবল বাইবেলের বা ধর্মীয় চশমা দিয়ে দেখছে না। বরং তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নিপীড়ন এবং সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতো নামী প্রতিষ্ঠানের জরিপেও উঠে এসেছে যে, তরুণ রিপাবলিকান সমর্থকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন মনে করে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রভাব প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি খাটাচ্ছে।
যদিও আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের মাঝে এই ভাবাবেগে ধস নেমেছে, তবুও ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দে খ্রিস্টান জায়নবাদী দলগুলোর রাজনৈতিক ও আর্থিক দাপট এখনো বেশ অটুট। ইসরায়েলপন্থী এই শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিজেদের অনুকূলে রাখতে প্রতিবছর লবিংয়ের পেছনে বিপুল অর্থ ঢালছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় ইসরায়েলপন্থী খ্রিস্টান সংগঠনগুলোর সম্মিলিত বাৎসরিক আয়ের পরিমাণ বর্তমানে কয়েক বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। গবেষকদের মতে, ওয়াশিংটনে লবিং করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে বা তৃণমূল স্তরে বিশাল সংখ্যক মানুষকে ইসরায়েলের পক্ষে সংগঠিত করার দক্ষতাই এই গোষ্ঠীগুলোর আসল শক্তি।
তা সত্ত্বেও, মার্কিন তরুণদের এই আকস্মিক ও নাটকীয় মনোভাব পরিবর্তন আগামী দিনে হোয়াইট হাউসের রাজনীতি এবং ওয়াশিংটন-তেল আবিব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতিহাসবিদদের মতে, নতুন প্রজন্ম এখন ইসরায়েলকে বাইবেলের কোনো দৈববাণীর অংশ না ভেবে মানবাধিকার ও নৈতিকতার মাপকাঠিতে বিচার করছে। আর এই কারণেই খোদ আমেরিকার মাটিতেই ‘খ্রিস্টান জায়নবাদে’র ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা