
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সুষম আঞ্চলিক বৈষম্য দূর ও প্রশাসনিক সংস্কারকে প্রাধান্য দিয়ে এই বিশাল উন্নয়ন বাজেট প্রণীত হয়েছে।
আজ সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বর্তমান সরকারের অধীনে প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন এনইসি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের উন্নয়ন কর্মসূচির বিস্তারিত জানান। ব্রিফিংয়ের সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নতুন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট সচিবরা অংশ নেন। এই সভায় সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)-এর একটি উপদেষ্টা কমিটির তৈরি করা আগামী ৫ বছরের কৌশলগত আর্থিক পরিকল্পনা কাঠামোর নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত মূল এডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এই বরাদ্দের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে অভ্যন্তরীণ বা সরকারি তহবিল থেকে এবং বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হিসেবে। সরকারের বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়ায় এবারের এডিপির আকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় বেশি।
এবারের এডিপিতে বড় আকারে নতুন প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে ১ হাজার ২৭৭টি নতুন স্কিমের সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ৮০টি এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অধীন ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে সরকারের জোরালো গুরুত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে কঠোর দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সমাপ্তির তালিকায় থাকা প্রকল্পগুলোকে সবার আগে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেয়াদ পার হয়ে যাওয়া প্রকল্পে নতুন করে অর্থ অপচয় রোধে ব্যয়ের লাগাম টানার কথা বলা হয়েছে। সংশোধিত এডিপির তুলনায় নতুন এডিপির আকার প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে বরাদ্দ ৪৮.৪৪ শতাংশ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ৫২.৭৮ শতাংশ বেড়েছে।
নতুন এই উন্নয়ন বাজেটে দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান তৈরি, নারীর ক্ষমতায়ন, পর্যটন, নীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) এবং সবুজ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মোট ১৫টি খাতের মধ্যে স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তায় সামাজিক উন্নয়ন খাতের জন্য ১৭... হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্পগুলো হিসাবভুক্ত করলে মোট এডিপির প্রকৃত আকার দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ও নিজস্ব খাত থেকে আসবে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯২৩ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সাহায্য ১ লাখ ১০ হাজার দশমিক ৯০ কোটি টাকা। পুরো কর্মসূচির মধ্যে ৯৭১টি বিনিয়োগ ও জরিপ প্রকল্পে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯১৪ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা এবং ১০৭টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে ২ হাজার Stamp৭৯৬ দশমিক ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা’ নামক ব্লক বরাদ্দ হিসেবে ৩৮... হাজার ২৭ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের চিত্রে দেখা যায়, বরাবরের মতো পরিবহন ও যোগাযোগ খাত সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৯২ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা (১৬.৭০ শতাংশ) বরাদ্দ পেয়েছে। এরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে শিক্ষা খাত, যার পরিমাণ ৪৭ হাজার ৫৯১ দশমিক ১২ কোটি টাকা (১৫.৮৬ শতাংশ)। স্বাস্থ্য খাতে দেওয়া হয়েছে ৩৫... হাজার ৫৩৫ দশমিক ৫০ কোটি টাকা (১১.৮৪ শতাংশ)। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২... হাজার ৬৯১ দশমিক ৫৪ কোটি টাকা (১০.৯০ শতাংশ) এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে ২০... হাজার ৩৬১ দশমিক ৭২ কোটি টাকা (৬.৭৯ শতাংশ) দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচটি প্রধান খাতই মোট বরাদ্দের ৬২ শতাংশের বেশি অর্থ পেয়েছে।
মন্ত্রণালয় ও একক বিভাগ হিসেবে বরাদ্দের শীর্ষে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, যার আর্থিক আকার ৩৩... হাজার ৭৩৫ দশমিক ১০ কোটি টাকা (১১.২৫ শতাংশ)। সড়ক ও জনপথ বিভাগ পেয়েছে ৩০... হাজার ৭৪১ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা (১০.২৫ শতাংশ) এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ পেয়েছে ২৬... হাজার ৮০৬ দশমিক ২৬ কোটি টাকা। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ২০... হাজার ৮৩৫ দশমিক can৪৪ কোটি টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯... হাজার ৪৪০ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ বিভাগ ১৪... হাজার ৯৩৮ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা পেয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১৭... হাজার ৪০৩ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৮... হাজার ২২০ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা এবং নৌপরিবহন ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ও বড় অঙ্কের বরাদ্দ পেয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ডেল্টা প্ল্যান ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে বিদেশি ফান্ড নিশ্চিত হয়েছে, পিপিপি উদ্যোগ রয়েছে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করবে—সেগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
আইএমইডির তথ্যমতে, জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৩৬.১৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছর শেষ করার লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও সম্পন্ন না হওয়া ২৬টি প্রকল্প আগামী অর্থবছরের ঝুলিতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।