
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে নতুন আশার বার্তা এসেছে সুইজারল্যান্ড থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথম দফার বৈঠক শেষ হয়েছে এবং মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান জানিয়েছে, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (২২ জুন) শেষ হওয়া এই বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীরা। গত সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার পর রোববার সুইজারল্যান্ডে নতুন এই আলোচনা শুরু হয়।
সোমবার প্রকাশিত কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, একটি ‘উচ্চপর্যায়ের কমিটি’ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনায় একমত হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো সপ্তাহজুড়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক চলবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
আলোচনায় যুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে ইরানের বিভিন্ন বক্তব্যের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করাই ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে একটি বিশেষ ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুর কিছু বিষয়ও আলোচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ওই কূটনীতিক।
সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন শহরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদলগুলো ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি হিসেবে এই কাঠামো ব্যবহার করবে বলেও তিনি জানান।
প্রাথমিক চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা
গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতায় ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার ছিল। ওই সমঝোতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে এরপর দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ইসরাইলি বিমান হামলায় বহু লেবাননি নিহত হন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপরও সংঘর্ষ ও বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় শনিবার ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। যদিও জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্য বলছে, প্রণালিটি দিয়ে নৌযান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
কাতার ও পাকিস্তানের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার বিষয়টি তদারকির জন্য লেবানন সরকার ও মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতায় একটি বিশেষ সমন্বয় কাঠামো গঠনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সম্মত হয়েছে।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
লুসার্নে বৈঠক শুরুর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন, ইরানকে ‘অবিলম্বে লেবাননে থাকা তাদের বড় অঙ্কের বেতন পাওয়া প্রতিনিধিদের সমস্যা সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে’।
তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে তিনি ‘আবারও খুব কঠোরভাবে ইরানের ওপর আঘাত হানার’ পথ বেছে নেবেন।
এর জবাবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ‘তারা কি বুঝতে পারে না, তাদের হুমকির যদি সত্যিই কোনো প্রভাব থাকত, তাহলে আজ তাদের এমন অসহায় অবস্থায় থাকতে হতো না? তারা শুধু কথা বলে, আর কাজ করে দেখাই আমরা।’
রোববার সংঘর্ষ কিছুটা কমলেও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেছেন, উত্তর ইসরাইলের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন হলে দক্ষিণ লেবাননে সেনা মোতায়েন অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনাদের উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সংগঠনটি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
নতুন সম্পর্কের ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আলোচক ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনাকে নতুনভাবে শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তার ভাষ্য, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা বন্ধ করতে সম্মত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রস্তুত। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
এ ছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রীও সুইজারল্যান্ডে উপস্থিত ছিলেন। পুরো সংঘাতকালেই পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং এর আগে দুই দেশের মধ্যে আরেক দফা আলোচনারও আয়োজন করেছিল। কাতারও সমানভাবে মধ্যস্থতা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা যে প্রাথমিক সমঝোতায় সই করেন, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দ্রুত যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছিল।
প্রাথমিক সমঝোতায় ইরানের বন্দরে যাওয়া-আসা করা জাহাজের ওপর আরোপিত সামরিক অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ও ছিল। পাশাপাশি ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি এবং দেশটির ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি এখনো আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
বাস্তবে বন্ধ হয়নি হরমুজ?
যদিও ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের দাবি করেছে, সামুদ্রিক জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ওই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত ছিল।
তথ্য বলছে, কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং পণ্যবাহী জাহাজকে প্রণালিতে প্রবেশ, বের হওয়া ও চলাচল করতে দেখা গেছে। বিকেলের দিকে অন্তত চারটি তেলবাহী জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করে। আরও কয়েকটি পণ্যবাহী জাহাজ পশ্চিম অংশ থেকে পূর্বদিকে এবং বিপরীতমুখী যাত্রা করেছে।
তবে কিছু জাহাজ অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রাখায় সব ধরনের চলাচলের তথ্য রেকর্ডে নাও থাকতে পারে।
লেবাননে সংঘাত অব্যাহত
সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও লেবাননে সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। প্রাথমিক সমঝোতার পরও ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ৬৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর হামলায় পাঁচজন ইসরাইলি সেনার মৃত্যু হয়েছে।
ইসরাইলের দাবি, হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাত ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের অংশ নয়। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে লেবাননও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। অপরদিকে ইসরাইল জানিয়েছে, লেবাননে অন্তত ৩৪ জন ইসরাইলি সেনা এবং উত্তর ইসরাইলে আরও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।