
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের যখন ঠিক শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে, তখনই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের উপকণ্ঠে আকস্মিক ও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোকে নিশানা করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তেল আবিবের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। আজ রোববার সংঘটিত এই শক্তিশালী বোমাবর্ষণের পর বৈরুতের বিস্তীর্ণ আকাশ জুড়ে কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী তৈরি হতে দেখা যায়।
আজ রোববার (১৪ জুন) এই সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলের উত্তর সীমান্ত অঞ্চলে হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক রকেট হামলার জুতসই জবাব দিতেই বৈরুতের শহরতলিতে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ আজ রোববার ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় বসতিগুলো লক্ষ্য করে তিনটি রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম ও স্পষ্ট লঙ্ঘন। হিজবুল্লাহর ছোড়া এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের শোমেরা ও শ্লোমি এলাকার কাছাকাছি গিয়ে আঘাত হানে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা নতুন করে আঞ্চলিক যুদ্ধ উসকে দিতে পারে। কারণ এর আগে গত সপ্তাহেও ইসরায়েল যখন বৈরুতের শহরতলিতে একইভাবে হামলা চালিয়েছিল, তখন ইরান সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে পাল্টা জোরালো হামলা চালায়। হিজবুল্লাহর প্রধান অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক তেহরান শুরু থেকেই একটি বিষয়ে জোর দিয়ে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যেকোনো সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে অবশ্যই লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন পুরোপুরি বন্ধের শর্তটি যুক্ত থাকতে হবে।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই সম্ভাব্য চুক্তিটি আসলে কবে নাগাদ স্বাক্ষরিত হবে, তা নিয়ে শনিবার থেকেই নতুন করে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে এই সংকটের প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ইতিবাচক বার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও গতকাল শনিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রোববারের মধ্যেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য চুক্তির যে খসড়া তথ্য জানা যাচ্ছে, তাতে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকছে কি না, তা মোটেও পরিষ্কার নয়।
চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে ব্যাপক সামরিক হামলা শুরু করে। এর ঠিক দুই দিন পর, অর্থাৎ ২ মার্চ থেকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি ভূখণ্ডে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে। পরবর্তীতে গত ৪ এপ্রিল প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের কূটনৈতিক দূতিয়ালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, লেবাননের মাটিতে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত থাকে।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া দেশটির প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ—যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ—নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা