
ইউক্রেন যুদ্ধের তহবিল জোগাতে রাশিয়ার গোপন ‘ছায়া বহরের’ (শ্যাডো ফ্লিট) ওপর এবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও নজিরবিহীন আঘাত হানল যুক্তরাজ্য। ইংলিশ চ্যানেলে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে রাশিয়ার সাথে সম্পৃক্ত একটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকার জব্ধ করেছে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক হওয়া এই জাহাজটি আগে থেকেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গত কাল শনিবার শেষ রাতের দিকে শুরু হওয়া প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী এই হাই-প্রোফাইল অভিযানে অংশ নেয় ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর শক্তিশালী চিনুক হেলিকপ্টার এবং নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস সাদারল্যান্ড’ (HMS Sutherland)-সহ একাধিক সামরিক যান। আজ রোববার আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা এএফপির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সচল রাখার রুশ চতুর প্রচেষ্টাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিয়েছে এই অভিযান। ব্রিটিশ রয়্যাল মেরিন কমান্ডো এবং দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির বিশেষ চৌকস কর্মকর্তারা যৌথভাবে ‘স্মার্টোস’ নামক সেই রুশ ট্যাঙ্কারটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন। ব্রিটেনের সামরিক ইতিহাসে এই ধরনের নেতৃত্বাধীন অপারেশন পূর্বে কখনো দেখা যায়নি।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, জব্দকৃত বিশাল জাহাজটিকে বর্তমানে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের অদূরে একটি নিরাপদ নোঙরস্থলে (অ্যাংকরেজ) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং সেটিকে ব্রিটিশ জলসীমায় সার্বক্ষণিক কঠোর সামরিক পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতির ওপর আঘাতের বিষয়ে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড্যান জার্ভিস মন্তব্য করেছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের বিপুল খরচ জোগাতে ক্রেমলিন দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ শ্যাডো ফ্লিট বা ছায়া বহর ব্যবহার করে আসছে। এই জাহাজটি নাটকীয়ভাবে আটক করার মাধ্যমে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অবৈধ যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য অত্যন্ত জোরালো ও স্পষ্ট পদক্ষেপ প্রদর্শন করল।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড্যান জার্ভিস আরও বলেন, ‘এই ছায়া বহর অচল করে দেওয়ার অর্থ হলো, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বজায় রাখার রসদগুলোর ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা এবং ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার রুশ সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।’
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের আরোপ করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিতে মস্কো এই ছায়া বহর ব্যবহার করছে। এমন সন্দেহভাজন শত শত রুশ জাহাজের ওপর ইতিমধ্যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাজ্য। সাধারণত অস্পষ্ট বা ভুয়া মালিকানাধীন এসব পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংকারগুলোর ব্রিটিশ কোনো সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই ঐতিহাসিক সামরিক সাফল্য প্রসঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক প্রতিক্রিয়ায় জানান, এই সফল অভিযান রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রের জন্য এক মস্ত বড় ধাক্কা। একই সাথে যারা পুতিনের এই অবৈধ যুদ্ধকে পেছন থেকে মদদ বা লাই দিয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য এটি একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা— কোনো অন্যায্য উপায়েই তারা পার পাবে না।