
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি, বিরোধী ও অন্যান্য দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এক উতপ্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোনো ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা ছাড়াই বিশাল অংকের এই বাজেট পেশ করায় এর বাস্তবায়ন যোগ্যতা নিয়ে খোদ সংসদ ভবনেই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ।
আজ রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে মারদিয়া মমতাজ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, সংসদের আজকের মূল কার্যসূচিতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার কথা থাকলেও, মারদিয়া মমতাজসহ সরকারি ও বিরোধী দলের প্রায় সব সদস্যই মূলত আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও আলোচনায় মেতে ওঠেন।
সংসদ অধিবেশনে মারদিয়া মমতাজ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:
‘সরকারের হাতে কি এমন আলাদিনের চেরাগ আছে যে এ বাজেট বাস্তবায়িত হবে? সংস্কার প্রস্তাব ছাড়াই এবারের বাজেট দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অবাস্তব আদায় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।’
বাজেটের ভেতরের দুর্বলতা ও বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন:
‘সমস্যা বরাদ্দে না, সক্ষমতার। গতকাল একজন মা ফোন করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে আমরাও ভোট দিয়েছি। অথচ বেসরকারি খাতের জন্য বাজেটে কোনো নির্দেশনা নেই। সরকারি চাকরিতে নিয়োগবাণিজ্য ও ঘুষবাণিজ্য হয়, তাদের বেতন বাড়ছে।’
এর পাশাপাশি দেশের কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন কিংবা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা নির্দেশনা না থাকায় তীব্র আপত্তি জানান মারদিয়া মমতাজ।
তবে জামায়াত এমপির এই সমালোচনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি সংসদে বলেন:
‘শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে প্রস্তাবিত বাজেটে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় গত ২০ বছরে যে অরাজকতা দেখেছি, আমাদের এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের তুলনা করা হয় সিঙ্গাপুরের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের।’
চলতি বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বড় অংকের বরাদ্দ রাখাকে স্বাগত জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ আরও যোগ করেন:
‘প্রস্তাবিত বাজেট একটি আশাবাদী বাজেট। শিক্ষা খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বাজেটকে ২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এটাকে জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে।’
এদিকে বিরোধী দলগুলোর কড়া সমালোচনার জাবাবে নওগাঁ–৩ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল বলেন, শুধু সমালোচনা করলেই হবে না, বরং এই বিশাল বাজেটকে মাঠে বাস্তবায়ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বিরোধী শিবিরের উদ্দেশে বলেন:
‘যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন দরকার। সমালোচনা না করে এ বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে তাদের সহযোগিতা করা উচিত।’
অন্যদিকে, শেরপুর–১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন বাজারের কষ্টকে সামনে এনে সুশাসনের অভাব নিয়ে কথা বলেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন:
‘কত টাকার বাজেট দিলেন, মানুষ তা দেখে না। মানুষ দেখে বাস্তবতা। করল্লার দাম কমল কি না, মানুষ তা দেখে। বারবার বলা হচ্ছে কার্ড দেওয়া হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম না কমলে তো কার্ডের টাকায় কুলাবে না।’
সরকারের অগ্রাধিকার খাতের সমালোচনা করে রাশেদুল ইসলাম আরও বলেন:
‘মানুষের অধিকারের দিকে না তাকিয়ে, সুশাসনের দিকে না তাকিয়ে ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চমৎকার! অথচ সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিলে স্বস্তি পেতাম।’
তবে জামায়াত ও অন্যান্যদের এই সমলোচনার বিপরীতে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা প্রস্তাবিত আর্থিক পরিকল্পনাকে চমৎকার আখ্যা দিয়ে বলেন:
‘এ বাজেট সুচিন্তিত বাজেট। সারা দেশের মানুষ এ বাজেটে খুশি হয়েছেন।’
একই সুর টেনে বিএনপির আরেক সংসদ সদস্য জালালউদ্দিন রাজস্ব আদায়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে বাজেটকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক বলে দাবি করেন। তিনি বলেন:
‘রাজস্ব হচ্ছে বাজেটের রক্ত। রক্ত ছাড়া যেমন শরীর চলে না, রাজস্ব ছাড়াও সরকার চলবে না। আগামী বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহে জোর দেওয়া হয়েছে। এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য।’