.jpg)
একদিকে নির্বাচন শেষ, নতুন সরকারও গঠিত হয়েছে। অন্যদিকে একশো দিনের বেশি সময় ধরে স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত, মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর বিধিনিষেধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ এবং বিক্ষোভে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যুর দাবি। পাকিস্তান-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা নির্বাচনের পরও পুরোপুরি থামেনি।
২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গ্রিসভিত্তিক Geopolitico-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া যোগাযোগ বিধিনিষেধ অঞ্চলটির দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ব্যাংকিং, ব্যবসা, শিক্ষা থেকে সংবাদ সংগ্রহ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়েছে। তবে পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, টানা ৯৯ দিন বন্ধ থাকার পর ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রডব্যান্ড ও ডিএসএল সংযোগ পুনরায় চালু করা হয়। ৩জি ও ৪জি মোবাইল ডেটা তখনও অনেক এলাকায় বন্ধ বা সীমিত ছিল।
পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামোয় অঞ্চলটি ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর’ নামে পরিচিত। বৃহত্তর কাশ্মীরের পুরো ভূখণ্ডই ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ নিজেদের বলে দাবি করে। বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি বা জেকেজেএএসি—ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সংগঠনের একটি জোট। গত ৫ জুন অঞ্চলটির কর্তৃপক্ষ সংগঠনটিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই দিন থেকেই ইন্টারনেট ও যোগাযোগের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়।

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল আঞ্চলিক আইনসভার ৪৫টি আসনের মধ্যে ১২টি সংরক্ষিত আসন বাতিল করা। এসব আসন ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানের অন্য অংশে বসবাসরত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অঞ্চলের বাইরে বসবাসকারী ভোটারদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার গঠনে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার সমর্থকেরা এটিকে কাশ্মীরি শরণার্থীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন।
তবে কেবল ১২টি আসনের বিরোধ থেকেই এই অস্থিরতা তৈরি হয়নি। হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) আগস্টের অনুসন্ধান বলছে, এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ, প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিধিনিষেধ এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ কাজ করেছে। এইচআরসিপির মতে, কর্তৃপক্ষের ক্রমশ সংঘাতমুখী প্রতিক্রিয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগ’ পরিস্থিতিকে আরও মেরুকৃত করেছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি স্বীকার করেছে, সহিংসতার মাত্রা এবং বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বর্ণনা রয়েছে।
জুনে শুরু হওয়া বিক্ষোভ জুলাইয়ের নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আরও সহিংস হয়ে ওঠে। প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে; এর মধ্যে বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ সামগ্রিক কোনো চূড়ান্ত হিসাব দেয়নি, তবে অন্তত সাতজন পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করাও কঠিন হয়েছে।
আঞ্চলিক নির্বাচন তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয় এবং শেষ ধাপ শেষ হয় ১০ আগস্ট। নিরাপত্তার কারণে বিক্ষোভের কয়েকটি শক্ত ঘাঁটিতে ভোট গ্রহণ হয়নি বা বিঘ্নিত হয়েছে। বাকি আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে নতুন সরকার গঠিত হয়। এই প্রক্রিয়া নিয়েও আন্দোলনকারীদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে; নির্বাচন কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, অনুপস্থিত আসনগুলো সরকার গঠন বা পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতাকে বাধাগ্রস্ত করে না।
সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস জানিয়েছে, স্বাধীন সাংবাদিক রাজি তাহির ও মুহাম্মদ সাইফকে ১ আগস্ট ইসলামাবাদের একটি কার্যালয় থেকে পুলিশের পোশাক পরা ব্যক্তিরা নিয়ে যান। সিপিজে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের দাবি জানাচ্ছিল এবং বলেছিল, তারা পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের অস্থিরতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। পাকিস্তানি পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথম দিকে তাদের হেফাজতের কথা স্বীকার করা হয়নি।
কাশ্মীরি কবি ও সাংবাদিক আহমদ ফারহাদকেও ২০ জুন থেকে প্রশাসনিক আটক রাখার কথা জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
২৫ আগস্টের এক বিবৃতিতে সংস্থাটি তার আটককে ‘খামখেয়ালি’ বা যথাযথ আইনি ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করে অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানায়। অ্যামনেস্টির অভিযোগ, তাকে বিক্ষোভের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল; প্রতিবাদে তিনি অনশনও শুরু করেছিলেন।
বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কাজও কঠিন হয়েছে। আগস্টে পাকিস্তান সরকার নতুন নির্দেশনা জারি করে, যার আওতায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক, স্থানীয় কর্মী, ফ্রিল্যান্সার ও ‘ফিক্সারদের’ ইসলামাবাদ, লাহোর ও করাচির বাইরে কাজের জন্য সরকারি অনুমোদন বা অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রাখা হয়। সিপিজের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা কাশ্মীরের বিক্ষোভ নিয়ে স্বাধীন সংবাদ সংগ্রহ আরও সীমিত করতে পারে। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সিপিজের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব রাজনীতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। অনলাইন ব্যাংকিং অচল হয়ে পড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষা পিছিয়ে যায় এবং সাংবাদিকেরা তথ্য যাচাই করতে সমস্যায় পড়েন। এইচআরসিপির অনুসন্ধানে বলা হয়, দীর্ঘ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ব্যাংকিং, শিক্ষা, বাণিজ্য, পরিবহন, সরকারি সেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলেছে।
তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। প্রথমে কয়েকটি জেলায় ধাপে ধাপে ইন্টারনেট চালুর ঘোষণা দেয় আঞ্চলিক সরকার। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রডব্যান্ড ও ডিএসএল সংযোগ বৃহত্তর পরিসরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরও মোবাইল ইন্টারনেট পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে ‘শতদিনের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ শেষ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও যোগাযোগ-সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বর্তমান সংকট তাই শুধু একটি নির্বাচন কিংবা কয়েকটি সংরক্ষিত আসনের বিরোধে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক ক্ষোভ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিবাদ মোকাবিলা করবে—এসব পুরোনো প্রশ্ন।
এইচআরসিপির অনুসন্ধানের সারকথাটিও সেখানেই: বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের বড় অংশ মনে করছে, এই সংকটের সমাধান শক্তিপ্রয়োগে নয়—রাজনৈতিক আলোচনায় খুঁজতে হবে। নির্বাচন শেষ হয়েছে, সরকার গঠিত হয়েছে; কিন্তু কাশ্মীরের রাস্তায় জমে থাকা অসন্তোষের হিসাব এখনো শেষ হয়নি।