
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রশাসনের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর কিয়েভের রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যুদ্ধের এই সংকটকালীন সময়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরে দুর্নীতির এমন খবর জেলেনস্কির ভাবমূর্তি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া সামরিক সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে কারা?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ এবং প্রশাসনের অত্যন্ত প্রভাবশালী কয়েকজন ‘কি-এইড’ বা প্রধান সহযোগীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা আপসহীন অবস্থানের কথা বলে আসছেন, তবে তাঁর নিজের বলয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো তাঁকে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে?
তদন্তকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে প্রধানত তিনটি বড় দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
১. সামরিক কেনাকাটায় অনিয়ম: প্রতিরক্ষা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও রসদ কেনাকাটায় বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দাম দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর জন্য খাদ্য ও পোশাক সরবরাহের চুক্তিতে বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২. মানবিক সহায়তার অপব্যবহার: পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আসা মানবিক সহায়তার একটি অংশ কালোবাজারে বিক্রি বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
৩. অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে তছরুপ: যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দেওয়ার অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া ও গৃহীত পদক্ষেপ
দুর্নীতির এই খবরগুলো প্রকাশ্যে আসার পর জেলেনস্কি দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি বেশ কয়েকজন উপ-মন্ত্রী এবং আঞ্চলিক গভর্নরকে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। জেলেনস্কি এক ভাষণে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, "পুরানো ব্যবস্থায় ফেরার কোনো সুযোগ নেই" এবং যুদ্ধের এই সময়ে যারা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও উদ্বেগ
ইউক্রেনকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU): ইইউ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ইউক্রেনের সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন একটি বাধ্যতামূলক শর্ত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য ইউক্রেনে পাঠানো অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে অডিটের দাবি তুলেছেন। এই দুর্নীতির অভিযোগগুলো ভবিষ্যতে সামরিক সহায়তার প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জেলেনস্কি একদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, অন্যদিকে ঘরের ভেতরের এই ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। এই সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার সম্পন্ন করা জেলেনস্কি প্রশাসনের জন্য এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা।