
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। তেহরানের লাগাম টেনে ধরার জন্য তাঁর সামনে এখন যেসব পথ খোলা আছে, তার প্রায় প্রতিটিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিকূল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে একটি নতুন ও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছানোর যে আশা ট্রাম্প প্রশাসন করেছিল, তা বর্তমানে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) প্রয়োগের নীতি বজায় রাখলেও ইরান তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এবং মধ্যস্থতাকারীদের বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো পক্ষই নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
ট্রাম্পের সামনে থাকা ‘ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প’সমূহ
আল জাজিরার বিশ্লেষণে ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলোকে মূলত তিনটি নেতিবাচক ধারায় ভাগ করা হয়েছে:
১. সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি:
ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থী একটি অংশ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সীমিত আকারে সামরিক হামলার কথা ভাবছে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও বিধ্বংসী যুদ্ধের সূত্রপাত করতে পারে, যা মার্কিন স্বার্থ এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হবে।
২. অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সীমাবদ্ধতা:
ইরানের ওপর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও দেশটি তা মানিয়ে নেওয়ার কৌশল রপ্ত করেছে। চীনের মতো দেশগুলোর কাছে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখা এবং ছায়া অর্থনীতির মাধ্যমে তেহরান তাদের টিকে থাকার পথ খুঁজে নিয়েছে। ফলে শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর কৌশলটি আর আগের মতো কার্যকর হচ্ছে না।
৩. নিষ্ক্রিয়তা ও ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতি:
যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি চলতে দেয়, তবে ইরান খুব দ্রুতই পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা (Nuclear Breakout Time) অর্জন করে ফেলবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে, যা ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের মতো মার্কিন মিত্রদের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ।
ভৌগোলিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ
ট্রাম্প বর্তমানে দুই দিক থেকে চাপের মুখে রয়েছেন:
ইসরায়েলি চাপ: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানকে দমনে আরও কঠোর হওয়ার জন্য ওয়াশিংটনকে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন।
আমেরিকান জনমত: যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়, যা ট্রাম্পের নির্বাচনী সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পররাষ্ট্র নীতির চ্যালেঞ্জ
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর স্বীকার করেছে যে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংলাপের সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় তাঁরা কোনো আলোচনায় বসবেন না। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে যে, ইরানকে আগে তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে হবে।
প্রতিবেদনটির মূল নির্যাস হলো—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে কোনো ‘সহজ সমাধান’ নেই। প্রতিটি বিকল্পই হয় সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, নতুবা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা মেনে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আল জাজিরা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কূটনৈতিক ব্যর্থতা ট্রাম্পকে এমন এক বিপজ্জনক পথে নিয়ে গেছে যেখানে তাঁকে কম ক্ষতিকর বিকল্পটি বেছে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা।