
লাতিন আমেরিকার মঞ্চ থেকে উন্নত বিশ্বের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা—তার অভিযোগ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি ধনী রাষ্ট্রগুলোর আচরণ এখনো ‘নব্য ঔপনিবেশিক’ মানসিকতার প্রতিফলন।
শনিবার (২১ মার্চ) বোগোতা-এ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জোট সিইএলএসি-এর ১০ম সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন।
যদিও তিনি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নাম নেননি, তবে তার বক্তব্যে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। বিশেষ করে ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো-কে তুলে নেওয়া এবং কিউবার ওপর জ্বালানি অবরোধের প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে লুলা বলেন, ‘কারো পক্ষে এটা ভাবা সম্ভব নয় যে তারা অন্য দেশের মালিক। কিউবা আর ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করা হচ্ছে, তা কি গণতান্ত্রিক?’
আফ্রিকার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের ফোরামে লুলা উল্লেখ করেন, ইতিহাসজুড়ে এই অঞ্চলের দেশগুলো সোনা, রুপা, হীরা ও খনিজ সম্পদের জন্য শোষণের শিকার হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের যা কিছু ছিল তা কেড়ে নেওয়ার পর এখন তারা আমাদের কাছে থাকা বিরল খনিজ এবং দুর্লভ মৃত্তিকার (রেয়ার আর্থ) মালিক হতে চায়। তারা আমাদের আবার উপনিবেশ বানাতে চায়।’ বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের বিপুল খনিজ সম্পদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। উল্লেখ্য, গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল।
ভাষণে লুলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন। ইরাক যুদ্ধ ২০০৩-এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক বোমা তৈরির অজুহাতে এখন ইরান আক্রমণ করা হয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের রাসায়নিক অস্ত্রগুলো কোথায় ছিল? কে সেগুলো খুঁজে পেয়েছিল?’ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানকে ঘিরে সামরিক অভিযানের এই ধাপকে তিনি ওয়াশিংটনের পুরোনো হস্তক্ষেপবাদী নীতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে আখ্যা দেন এবং কোনো দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের বিরোধিতা করেন।
একই সঙ্গে তিনি ও গুস্তাভো পেত্রো বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ-এর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। লুলার ভাষায়, গাজা, ইউক্রেন ও ইরানের পরিস্থিতি প্রমাণ করে সংস্থাটি তার মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবি জানিয়ে বলেন, স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেত্রো যোগ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধ থামাতে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, সেটি এখন কেবল সংঘাতের দর্শক হয়ে আছে।
আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলের নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে যাচ্ছেন লুলা। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার অবস্থান ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তবে কলম্বিয়ার এই সম্মেলনে লাতিন আমেরিকার সব দেশের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত না থাকায় অঞ্চলটির রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সম্মেলনে ব্রাজিল, উরুগুয়ে, বুরুন্ডি ও কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ছাড়াও গায়ানা এবং সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডাইনসের প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, লুলার এই জোরালো বক্তব্য মূলত ট্রাম্পের ‘মনরো ডকট্রিন’ ঘিরে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া।
সূত্র: আল জাজিরা