
গত বছরের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে পতন ঘটে শেখ হাসিনার। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন শান্তিতে নোবেল জয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের সাধারণ মানুষ মনে করেছিলেন তার হাত ধরেই গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হবে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের সেই আশা এক প্রকার তিনি হতাশায় পরিণত করেছেন। কারণ নির্বাচন নিয়ে তাকে তার মতো কাজ করতে দেয়া না হয় তাহলে তিনি পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ মে) মুহাম্মদ ইউনূস বাধাহীনভাবে কাজ করার জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন না পেলে পদত্যাগের হুমকি দেন।
মুহাম্মদ ইউনূস তার পদত্যাগ ঘোষণার ভাষণের খসড়া তৈরির পর্যায়ে গিয়েছিলেন বলে তার সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। অন্যান্য উপদেষ্টা তাকে বোঝান যে তার পদত্যাগে বাংলাদেশ আরও অস্থিতিশীল হবে।
ওই কর্মকর্তা ফোনে বলেন, এ বছর নির্বাচন হওয়া উচিত বলে সেনাপ্রধান সম্প্রতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে অখুশি হয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলোর সমালোচনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপি যেকোনো নির্বাচনে জয় পাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচন যত দ্রুত হবে, সেই সম্ভাবনা তত বেশি। শেখ হাসিনার দল লাঞ্ছনার মধ্যে রয়েছে এবং সম্প্রতি দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে দেশটিতে কার্যত অর্থবহ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলারও অবনতি ঘটেছে, আর তা ঠিক করার উদ্যোগগুলোও চলছে অগোছালোভাবে। সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা মুহাম্মদ ইউনূসের নিজের কোনো রাজনৈতিক সমর্থন নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো মোবাশ্বার হাসান বলেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূস একজন চমৎকার ব্যাংকার হতে পারেন, প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি দারুণ হতে পারেন, কিন্তু তার যে ঘাটতি রয়েছে, দিনের পর এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে তাঁর দৃঢ় ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব নেই।’
অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশে গণতন্ত্র ফেরাতে যারা তাকে সহযোগিতা করার কথা, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন ড. ইউনূসকে উপেক্ষা করছেন। ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন হওয়া উচিত গত বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের এমন বক্তব্যের পর তিনি ধৈর্য হারিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুন নাগাদ দেশ নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে ড. ইউনূস এমন ইঙ্গিত দিলেও তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি।
এদিকে বিএনপি প্রথসে অধ্যাপক ইউনূসের সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নীতিগত নানা বিষয়ে মতবিরোধের কারণে দলটি সহযোগিতা বন্ধ করেছে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে, অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর কর্মকর্তারা দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চান; যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের কিছু অঞ্চলে মানবিক সাহায্যের করিডর চালু করতে চান এবং দেশের প্রধান কর কর্তৃপক্ষকে (এনবিআর) ভাগ করতে চান।
বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের একটি নিষিদ্ধ আর অপরটি তড়িঘড়ি নির্বাচন চাইছে। এমন পরিস্থিতিতে অধ্যাপক ইউনূস সময় নিতে চাইছেন বলে মনে হয়।
ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক ইউনূসের সাবেক উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম ছাত্রদের নিজেদের পক্ষে টানার আশায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি অধ্যাপক ইউনূসকে পদত্যাগ না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুজন কথা বলেন। অধ্যাপক ইউনূস তাকে বলেন যে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না।
নাহিদ আরও বলেন, বিভিন্ন গোষ্ঠী অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং সরকারকে চাপ দিচ্ছে। তিনি (অধ্যাপক ইউনূস) মনে করছেন, তার পক্ষে কার্যকরভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করা আর সম্ভব নয়।
সূত্র: নিউ ইয়র্কটাইম