
ইসরায়েলি ক্যালেন্ডারে অন্যতম বিতর্কিত এবং উত্তেজনাকর দিন হলো 'জেরুজালেম দিবস' (Jerusalem Day)। এই দিনে হাজার হাজার ডানপন্থী ইসরায়েলি পতাকা নিয়ে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ওল্ড সিটির মুসলিম কোয়ার্টারের মধ্য দিয়ে মিছিল করে, যা 'ফ্ল্যাগ মার্চ' বা পতাকা মিছিল নামে পরিচিত। এই ঘটনাটি প্রায়শই ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা এবং বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়।
জেরুজালেম দিবস আসলে কী?
জেরুজালেম দিবস হলো একটি ইসরায়েলি জাতীয় ছুটি, যা ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় পূর্ব জেরুজালেম দখলের স্মৃতি স্মরণে পালিত হয়। ইসরায়েলিরা একে 'জেরুজালেমের পুনর্মিলন' হিসেবে অভিহিত করে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেম একটি অধিকৃত অঞ্চল হলেও, ইসরায়েল একে তাদের অবিভাজ্য রাজধানী হিসেবে দাবি করে। হিব্রু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আইয়ার মাসের ২৮ তারিখে এই দিনটি পালিত হয়।
পতাকা মিছিল বা 'ফ্ল্যাগ মার্চ' কী?
এই দিবসের প্রধান আকর্ষণ হলো পতাকা মিছিল। এতে মূলত কয়েক হাজার উগ্র ডানপন্থী ইহুদি যুবক অংশ নেয়। তারা ইসরায়েলি পতাকা হাতে গান গাইতে গাইতে এবং নাচতে নাচতে ওল্ড সিটির অলিগলি প্রদক্ষিণ করে।
মিছিলটি পশ্চিম জেরুজালেম থেকে শুরু হয়ে ওল্ড সিটির দেয়ালের দিকে অগ্রসর হয়। এর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি হলো 'দামাস্কাস গেট' (Damascus Gate) দিয়ে মুসলিম কোয়ার্টারে প্রবেশ করা। মিছিলটি শেষ হয় পবিত্র আল-আকসা মসজিদের দেয়াল সংলগ্ন 'ওয়েস্টার্ন ওয়াল' বা পশ্চিম দেয়ালে।
কেন এটি এত বিতর্কিত এবং উস্কানিমূলক?
এই মিছিলটি বেশ কয়েকটি কারণে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করে:
১. মুসলিম কোয়ার্টারে প্রবেশ: মিছিলকারীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফিলিস্তিনি জনবহুল এলাকাগুলোর মধ্য দিয়ে যায়, যা ফিলিস্তিনিরা তাদের সার্বভৌমত্ব এবং আত্মপরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখে।
২. বর্ণবাদী স্লোগান: মিছিল চলাকালীন অংশগ্রহণকারীরা প্রায়শই "আরবদের মৃত্যু হোক" (Death to Arabs) বা "তোমাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হবে" এর মতো অত্যন্ত উগ্র এবং বর্ণবাদী স্লোগান দেয়।
৩. ফিলিস্তিনিদের ওপর বিধিনিষেধ: মিছিলের নিরাপত্তার অজুহাতে ইসরায়েলি পুলিশ ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য করে এবং তাদের চলাচলের ওপর কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করে।
৪. সহিংসতা: প্রায় প্রতি বছরই এই মিছিলকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি উগ্রবাদী এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ইসরায়েলি পুলিশ মিছিলে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ফিলিস্তিনিদের ওপর চড়াও হয়।
আল-আকসা মসজিদ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট
জেরুজালেম দিবসে অনেক ইহুদি গোষ্ঠী আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে (যাকে তারা টেম্পল মাউন্ট বলে) জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করে। বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা, যেমন ইতমার বেন-গভির, অতীতে এই মিছিলে অংশ নিয়েছেন এবং উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে মদদ দিয়েছেন।
২০২১ সালে এই পতাকা মিছিলকে কেন্দ্র করেই ইসরায়েল এবং গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে ১১ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। হামাস সতর্ক করে আসছে যে, জেরুজালেম এবং আল-আকসার পবিত্রতা রক্ষা করতে তারা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশই পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয় না। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পতাকা মিছিলকে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করে থাকে।
জেরুজালেম দিবস এবং এর পতাকা মিছিল কেবল একটি উদযাপন নয়, বরং এটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের একটি জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ। এটি একদিকে ইসরায়েলি জাতীয়তাবাদের উগ্র প্রকাশ, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের ওপর দখলদারিত্বের প্রতীকী প্রদর্শনী।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই (Middle East Eye)