
চট্টগ্রামের লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখায় অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ ভল্টে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতির ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের দাবি, অর্থগুলো বিভিন্ন গ্রাহকের আমানতের। এ ঘটনায় ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন (৪১) এবং ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন মো. জাফরুল্লাহ তানভীরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে এত বড় অঙ্কের অর্থের ঘাটতি কীভাবে এক বছরের বেশি সময় ধরে নজরে এল না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিদিনের লেনদেন শেষে ক্যাশ ও ভল্টের হিসাব যাচাইয়ের নিয়ম থাকলে এত বড় গরমিল দীর্ঘ সময় অজানা থাকার কারণ কী—এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা এ মামলার নম্বর ২২/৪৩৮। দণ্ডবিধির ৪০৮, ৪২০ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। বাদী অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ (৫৮)। মামলায় কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন। শাখাটির ক্যাশ ও ভল্টের দায়িত্বে ছিলেন কামরুল হোসেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন শেষ হওয়ার পর নগদ অর্থের হিসাব এবং ভল্টে থাকা টাকার হিসাব মিলিয়ে দেখা হচ্ছিল। তখনই গরমিল ধরা পড়ে। পরবর্তী সময়ে হিসাব-নিকাশ, ভল্টসংক্রান্ত রেকর্ড, নথি ও অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি শনাক্ত করা হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘাটতির বিষয়ে কামরুল হোসেনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তিনি সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে। এরপর ব্যাংকের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, জাফরুল্লাহ তানভীরসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের সহযোগিতায় কামরুল ভল্ট থেকে অর্থ সরিয়ে তা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।
তবে মামলার দ্বিতীয় আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ ব্যাংকের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, “আমার ছেলে কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি শাখার গ্রাহকও নয়। সে আগে থেকেই গরুর খামারের ব্যবসা করে। অথচ তাকে ব্যাংকের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমার ছেলের কাছে এত টাকা দেওয়ার কোনো ব্যাংক রেকর্ড বা প্রমাণও দেখানো হয়নি।”
আজিম উল্লাহ আরও বলেন, “৯ আগস্ট রাত ১টার দিকে আমার স্ত্রীর মোবাইলে ব্যাংক থেকে ফোন করে বলা হয়, আমার ছেলে লালদীঘি ব্যাংকে আটক আছে। টাকা নিয়ে যেতে বলা হলেও কীসের টাকা, কত টাকা— কিছুই পরিষ্কার করে বলা হয়নি। আমার ছেলেকেও ফোনে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। এর আগে ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেনই অন্যদিনের মতো আমার ছেলেকে ফোন করে ডেকে নিয়ে যান। রাতেই আমরা সাত-আটজন আত্মীয়স্বজন নিয়ে ব্যাংকে যাই। কিন্তু ব্যাংকের লোকজন আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। পরে আমরা কোতোয়ালি থানায় গিয়ে ওসিকে বিষয়টি জানাই। পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে রাত আনুমানিক ২টার দিকে আবার ব্যাংকে গেলে প্রথমে আমাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে পুলিশ কৌশলে ব্যাংকে প্রবেশ করে আমার ছেলেসহ কামরুল হোসেনকে থানায় নিয়ে যায়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা দরকার। ব্যাংকের ভল্টে যদি ১ জুন ২০২৫ থেকে ৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন বিষয়টি ব্যাংকের নিয়মিত হিসাব ও তদারকিতে ধরা পড়েনি কেন? তাদের দাবি, একটি ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন শেষ হওয়ার পর ক্যাশ ও ভল্টের হিসাব মেলানোর নিয়ম রয়েছে। তাহলে এক বছরের বেশি সময় ধরে এত বড় অঙ্কের অর্থের ঘাটতি কীভাবে অজানা থাকল— এ প্রশ্নের উত্তরও তদন্তে বের করা প্রয়োজন।”
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, গ্রাহকদের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় এজাহারে নাম থাকা দুই আসামি কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ও তথ্যের রেকর্ডসহ ৬৪ জিবির একটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে।