
বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিচারপ্রার্থী মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের মুক্তির প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে দেশের আরও ১২টি জেলায় অনলাইন ই-বেইলবন্ড সিস্টেম চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে মোট ২৮টি জেলায় ই-বেইলবন্ড কার্যক্রম চালু হলো।
বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) সকালে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নতুন ১২টি জেলায় ই-বেইলবন্ড সিস্টেমের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
নতুন করে যে ১২টি জেলায় ই-বেইলবন্ড চালু হয়েছে সেগুলো হলো—টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কক্সবাজার, চাঁদপুর, রাঙামাটি, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও জামালপুর। এর আগে দেশের ১৬টি জেলায় এই কার্যক্রম চালু ছিল। ফলে আজ থেকে মোট ২৮টি জেলায় ই-বেইলবন্ড কার্যক্রম চালু হলো।
মন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রার্থী মানুষের হয়রানি বন্ধ করে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিচ্ছে। ই-বেইলবন্ড সিস্টেমও সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় একটি বেইলবন্ড দাখিল ও সম্পন্ন করতে ১২টি ধাপ অতিক্রম করতে হতো। নতুন ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থায় একই কাজ মাত্র দুই ধাপে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। আইনজীবীরা নিজেদের চেম্বার কিংবা যেকোনো স্থান থেকে স্মার্টফোনের মাধ্যমে অনলাইনে বেইলবন্ড দাখিল করতে পারবেন। বেইলবন্ড দাখিলের পর তা গ্রহণের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ওটিপির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। এতে বেইলবন্ড দাখিলের পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে।
মন্ত্রী বলেন, ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থায় বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে জামিনপ্রাপ্ত আসামি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কারাগার, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জেলা জজ আদালতে বারবার যাতায়াতের যে দুর্ভোগ ও হয়রানি পোহাতে হয়, তা অনেকাংশে দূর হবে। সরকার জনগণকে হয়রানি করতে চায় না; বরং আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে দেশের ১৬টি জেলায় ই-বেইলবন্ড কার্যক্রম চালু হওয়ার পর গত কয়েক মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ই-বেইলবন্ড অনলাইনে দাখিল হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা এবং জনগণের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছে। এর ধারাবাহিকতায় আজ আরও ১২টি জেলা এই কার্যক্রমের আওতায় এসেছে।
মন্ত্রী বিচারক, আইনজীবী ও কারা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো বন্দি যদি কম্পাউন্ডেবল বা আপসযোগ্য মামলায় কারাগারে আটক থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমার পাশাপাশি সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে।
তিনি আরও বলেন, বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে ই-বেইলবন্ডের পাশাপাশি মেডিয়েশন, লিগ্যাল এইডসহ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মামলার সংখ্যা কমানো এবং নিষ্পত্তির হার বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব জেলায় মামলা কমানো ও নিষ্পত্তির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হবে, সেসব জেলার সংশ্লিষ্টদের কীভাবে উৎসাহিত বা পুরস্কৃত করা যায়, সে বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা গ্রহণের চিন্তা করছে।
মন্ত্রী বলেন, ই-বেইলবন্ডের পাশাপাশি মেডিয়েশন ও অন্যান্য কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা আরও শক্তিশালী হবে।
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা ও অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস বক্তব্য রাখেন। এ সময় একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এসএম এরশাদুল আলম, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুরুল হোসাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ই-বেইলবন্ড সিস্টেম চালুর ফলে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি ও দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি জামিন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।