
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশি পোশাকের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ফলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় বস্ত্র রপ্তানিকারক ও তুলা ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। গত সোমবার এ চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহ আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে পৃথক একটি বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছায়।
ভারতের ক্ষেত্রে নতুন শুল্কহার নির্ধারিত হয়েছে ১৮ শতাংশ, যা আগের ৫০ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শুরুতে এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেয়েছিলেন ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা। কারণ তখন মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ১৯ শতাংশ, ভিয়েতনামের ২০ শতাংশ এবং চীনের ৩০ শতাংশ শুল্কহারের তুলনায় ভারত কিছুটা এগিয়ে থাকবে।
কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বিস্তারিত শর্ত প্রকাশের পর পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নেয়। শুধু শুল্কহার ২০ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো নয়, বাংলাদেশের বস্ত্র খাতকে বিশেষ সুবিধাও দিয়েছে ওয়াশিংটন। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে উৎপাদিত নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
এই শর্ত ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বস্ত্র রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। ট্রাম্প প্রশাসন যখন ভারতের পণ্যের শুল্কহার ১৮ শতাংশে নামায়, তখন তা ১১৮ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বস্ত্র ও পোশাক বাজারে ভারতের প্রবেশাধিকার আরও মজবুত করবে বলে আশা করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারতের অবস্থানও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা ছিল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বস্ত্র রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ। ভারতের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে রুশ তেল কেনার জেরে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমে যায় এবং ভারত বড় ধরনের মজুত সংকটে পড়ে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বস্ত্র রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তিকে খাতটির জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা ভারতের সেই সম্ভাব্য সুবিধাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সামগ্রিকভাবে ভারতের শুল্কহার ১৮ শতাংশ হলেও মার্কিন তুলা ব্যবহার করা বাংলাদেশি পোশাক শূন্য শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবে। ফলে বাজারে বাংলাদেশি পণ্য ভারতীয় পণ্যের তুলনায় কম দামে পাওয়া যেতে পারে।
আরও একটি দিক ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে বস্ত্র খাত থেকে। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তুলা আমদানিকারক এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতের তুলার প্রধান ক্রেতা। কয়েক বছর আগেও ভারতের মোট তুলা রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ যেত বাংলাদেশে।
তবে ২০২৪ সালে ভারতপন্থি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিলে বাংলাদেশ ব্রাজিল ও পশ্চিম আফ্রিকার মতো বিকল্প উৎস থেকে তুলা আমদানি বাড়ায়। এখন নতুন চুক্তির কারণে মার্কিন তুলা ব্যবহারে বাড়তি সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশ আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ভারতীয় তুলা রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়বে।
বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। মঙ্গলবার ভারতীয় বস্ত্র ও সুতা উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে চাপ সৃষ্টি হয় এবং রপ্তানিনির্ভর কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমে যায়। বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেও রূপ নিয়েছে। বিরোধী কংগ্রেস দল এ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচনা করেছে।
কংগ্রেসের দাবি, বাংলাদেশি বস্ত্রপণ্যের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা ভারতের অর্থনীতির জন্য দ্বিমুখী আঘাত। এতে দেশীয় তুলাচাষি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি সুতা উৎপাদনকারীরাও বিপাকে পড়বে।
কংগ্রেস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই বাণিজ্য চুক্তি ভারতের বস্ত্র শিল্পকে দুর্বল করছে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ঝুঁকির মুখে ফেলছে।’
রাজ্যসভার সংসদ সদস্য প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদীও সরকারের সমালোচনা করে এক্সে লেখেন, ‘এখন বাণিজ্যমন্ত্রী আমাদের বলবেন, বাংলাদেশ যেখানে শূন্য শুল্ক পাবে, সেখানে ১৮ শতাংশ শুল্ক দিয়ে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা কী সুবিধা পেল।’
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করেছে। একদিকে বাংলাদেশে ভারতের তুলা রপ্তানি আরও কমতে পারে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া বাংলাদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভারতীয় বস্ত্রখাত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি সই হতে এখনো এক মাস বাকি থাকায়, এই সময়ের মধ্যে নয়াদিল্লি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বাড়তি ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।