
একটি জার্সি, একটি দেশ আর একজন মানুষের দুই দশকের ভালোবাসার গল্প—অবশেষে তার শেষ অধ্যায়ও এসে গেল। যে ১০ নম্বর জার্সি গায়ে তুলে একদিন আর্জেন্টিনার স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন লিওনেল মেসি, সেই জার্সিকে বিদায় জানিয়ে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অধিনায়ক।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর থেকেই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছিলেন বিশ্বকাপজয়ী মেসি। শেষ পর্যন্ত সোমবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। বিদায়ের ঘোষণায় ছিল না কোনো আড়ম্বর, ছিল না নিজের কীর্তির হিসাব। বরং ছিল একটি জার্সির প্রতি আজীবন ভালোবাসা, সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং কোটি আর্জেন্টাইন মানুষের প্রতি গভীর আবেগ।
নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা লিখেছেন, ‘ফাইনালের পর থেকে যে সময়টা কেটেছে, অনেক ভেবেচিন্তে আমি সবাইকে জানাতে চাই—আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ফুটবল মাঠে প্রায় সব সাফল্যই যখন অর্জিত, তখন থামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই কিংবদন্তি। সিদ্ধান্তটি নিতে যে তার কতটা কষ্ট হয়েছে, সেটিও লুকাননি মেসি। তিনি বলেন, ‘এটা এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা নিতে গিয়ে হৃদয়ে খুব কষ্ট হয়েছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।’
এই বিদায় কোনো ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজের দেশকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় সাফল্য এনে দেওয়ার পরই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পর্দা নামছে মেসির। ২০২২ বিশ্বকাপ জয় এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা—আর্জেন্টিনার হয়ে তার অর্জনের তালিকায় যোগ হয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলো।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দশকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন মেসি। ২১ বছর আগে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হচ্ছে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবেই। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি কতটা অনন্য ছিলেন।
তবে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার মানুষের সম্পর্ক। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের ব্যর্থতার যন্ত্রণা, সমালোচনা এবং ফাইনালে বারবার হারের কষ্ট—সব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মেসিই হয়ে উঠেছেন সেই অধিনায়ক, যার হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দিয়েছিল আর্জেন্টিনা।
বিদায়ের সময় তাই দেশের মানুষের জন্যই ছিল তার সবচেয়ে আবেগঘন কথা। মেসি বলেন, ‘আপনাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য, ফুটবলের মাধ্যমে যেন আপনারা আর্জেন্টাইন হওয়ার গর্ব অনুভব করেন, সেটাই ছিল আমার চেষ্টা।’
এরপর নিজের বিদায়ের বিষয়টিও আরও স্পষ্ট করেন তিনি। বলেন, ‘আর বেশি সময় বাকি নেই, একে একে জীবনের অধ্যায়গুলো শেষ হয়ে আসছে। আর এই অধ্যায়টি শেষ করতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি জাতীয় দলে থাকা ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সবসময় ভালোবেসে যাব। আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছি, এখন আর দেওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই।’
মেসির বিদায়ে অবশ্য শূন্য হয়ে যাচ্ছে না আর্জেন্টিনা। নিজের কথাতেই নতুন প্রজন্মের ওপর আস্থার কথা জানিয়েছেন তিনি। তার পেছনে উঠে আসা তরুণদের জাতীয় দলে জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে বলেও মনে করছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
তবে জাতীয় দলের জার্সি ছেড়ে দিলেও সমর্থকের ভূমিকা থেকে সরে যাচ্ছেন না মেসি। এখন থেকে মাঠের বাইরে বসেই আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন তিনি। ভালো সময়ে যেমন পাশে থাকবেন, খারাপ সময়ে আরও বেশি করে থাকবেন—এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
বিদায়ী বার্তায় পরিবারের কথাও উল্লেখ করেছেন মেসি। দীর্ঘ ও কঠিন এই যাত্রায় পাশে থাকার জন্য পরিবার, কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন এমন সব স্মৃতি, যা তার নিজের ভাষায় কখনো ভোলার নয়।
সবশেষে মেসির বিদায়ী বার্তায় ফুটবলারের চেয়ে বেশি করে ধরা দিয়েছে একজন আর্জেন্টাইনের আবেগ। তিনি বলেন, ‘আমি এই শান্তি ও গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি যে, আমার সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আপনাদের স্বপ্নের মতো কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে পেরেছি। আপনাদের সঙ্গে সেসব মুহূর্ত বেঁচে থাকা ছিল অবিশ্বাস্য এক পাগলামি! আমি আপনাদের ভালোবাসি!’
তারপর সেই পরিচিত ডাক—‘চলো আর্জেন্টিনা!’
গত ২১ জুলাই ফিফা ফাইনালের দুই দিন পর লেখা এই বার্তাটি প্রকাশের পর মেসি জানিয়েছেন, বাবার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর তার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়েছে। অর্থাৎ বিদায়ের সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া নয়; অনেক ভাবনা, আবেগ ও জীবনের বাস্তবতার মধ্য দিয়েই সেখানে পৌঁছেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনার জার্সি আর পরবেন না মেসি। কিন্তু সেই জার্সির সঙ্গে তার নাম মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। কাতারে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ট্রফি জয়, কোপা আমেরিকার শিরোপা, চোখের জলে ভেজা হার এবং অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি তোলার মুহূর্ত—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা ও মেসির গল্প এখন ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ।
ক্লাব ফুটবলে অবশ্য তার যাত্রা থামছে না। ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। কিন্তু জাতীয় দলের ক্ষেত্রে পর্দা নেমে গেল সেই অধ্যায়ের, যেখানে একটি ছেলের স্বপ্ন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল একটি দেশের সবচেয়ে বড় ফুটবল-গর্বে।
মেসি বিদায় নিলেন। রেখে গেলেন একটি প্রশ্ন—আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১০ নম্বরের পরবর্তী গল্পটি কে লিখবেন?
উত্তর সময়ই দেবে। তবে মেসির অধ্যায়ের মতো আরেকটি গল্প লেখা যে কতটা কঠিন হবে, তা হয়তো এখনই বুঝতে পারছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।