
অবশেষে সেই ঘোষণা এল, যার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল আর্জেন্টিনা ও বিশ্ব ফুটবল। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি টানার কথা জানান তিনি।
সোমবার ইনস্টাগ্রামে হাতে লেখা একটি নোটের ছবি প্রকাশ করে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন মেসি। নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি লিখেছেন, ‘ফাইনালের পর সময় পেরিয়ে গেছে। অনেক ভেবেচিন্তে সবাইকে জানাতে চাই, আমি আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা আমাকে কষ্ট দিয়েছে—এখনো ভেতর থেকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, সময় এসে গেছে।’
আর্জেন্টিনার জার্সিতে পুরো ক্যারিয়ারেই নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন মেসি। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। শুধু সাম্প্রতিক কয়েক বছরে যখন আমরা সবকিছু জিতেছি, তখন নয়; তার আগেও। এই জার্সির জন্য সবসময় লড়েছি, মাঠে সবকিছু দিয়েছি—ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের আনন্দ দিতে এবং আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত করতে।’
মেসির অবসরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার ব্যক্তিজীবনের একটি কঠিন অধ্যায়েরও যোগ রয়েছে। গত ৮ আগস্ট আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের একটি হাসপাতালে মারা যান তার বাবা হোর্হে মেসি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া বার্তার শেষদিকে এ বিষয়টি উল্লেখ করে মেসি লিখেছেন, ‘আমি এই কথাগুলো ২১ জুলাই লিখেছিলাম, ফাইনালের দুই দিন পর। আজ, আমার বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’
এতে স্পষ্ট হয়, আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া নয়। বিশ্বকাপের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলেন মেসি। বাবার মৃত্যুর পর নিজের সিদ্ধান্তে আরও দৃঢ় হন তিনি।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের গভীরতাও তুলে ধরেছেন এই তারকা। মেসির ভাষায়, ‘আমি জাতীয় দলের অংশ হতে ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সবসময় ভালোবাসবো। আমি আমার সবকিছু দিয়ে দিয়েছি। আমার আর কিছু দেওয়ার নেই। তাছাড়া দারুণ কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা এখানে থাকার যোগ্য।’
দীর্ঘ দুই দশক ধরে সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মেসি। তিনি লিখেছেন, ‘গত ২০ বছরের সব ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। মাঠ থেকে আপনাদের কণ্ঠ শুনতে আমি ভীষণ মিস করবো। এখন আমি আপনাদেরই একজন হয়ে বাইরে থেকে দলকে সমর্থন করবো—ভালো সময়েও, খারাপ সময়েও; বিশেষ করে খারাপ সময়গুলোতে।’
জাতীয় দলের সতীর্থ, কোচ, কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তাদের সঙ্গে কাটানো সময়কে জীবনের ‘অবিস্মরণীয় স্মৃতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ারের শেষটা হয়েছে সাফল্যে মোড়ানো। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেন তিনি। সেটি ছিল আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়।
এর আগে ২৮ বছরের দীর্ঘ শিরোপা-খরা কাটিয়ে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। মেসির নেতৃত্বে ২০২৪ সালেও কোপা আমেরিকার ট্রফি নিজেদের ঘরে রাখে দলটি।
তবে এই সাফল্যের আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির পথচলা ছিল হতাশায় ভরা। ২০১৬ সালে টানা তিনটি ফাইনালে পরাজয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আবার জাতীয় দলে ফেরেন। শেষ পর্যন্ত সেই মেসিই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোল করা খেলোয়াড়ও মেসি। জাতীয় দলের জার্সিতে ২০৩ ম্যাচে তার গোল ১২৪টি। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল ইতিহাসেও পুরুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড তার দখলে।
দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অসংখ্য রেকর্ডের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে মেসির নাম। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্নও পূর্ণতা পেয়েছে।