
সংসদীয় বিশেষ কমিটি ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা শেষে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ কিছু সংশোধনসহ পাস করার সুপারিশ করেছে, যেখানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে কমিটির প্রধান জয়নুল আবদিন এমপি এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল অধ্যাদেশে আওয়ামী লীগের নাম উল্লেখ করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার যে ধারা ছিল, তা কিছু পরিবর্তন বা পরিমার্জনের মাধ্যমে অনুমোদনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সংশোধনীগুলোর নির্দিষ্ট বিবরণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা এই অধ্যাদেশে সরকারকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সভা, সমাবেশ, মিছিল ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শাসনের অভিযোগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই এটি প্রণয়ন করা হয়। বিশেষ কমিটি এই অধ্যাদেশটি বাতিল না করে সংশোধনসহ স্থায়ী আইনে রূপান্তরের পক্ষে মত দিয়েছে, ফলে দলটির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ সুগম হতে পারে।
অন্যদিকে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত কঠোর আইনটি আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। এই অধ্যাদেশে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও সংসদীয় বিশেষ কমিটি এটিকে স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ’সহ মোট ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত অনুমোদন না দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরবর্তীতে বিল আকারে উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফলে এই আইনটির কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত থাকছে।
এছাড়া মানবাধিকার কমিশন আইন, তথ্য অধিকার আইন এবং গুম বিরোধী আইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে কমিটি। তড়িঘড়ি করে এগুলো পাস না করে পূর্ণাঙ্গ বিল হিসেবে সংসদে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিগত সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার এই আইন প্রণয়ন করেছিল, যেখানে গুমকে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল।
কমিটির এই স্থগিতাদেশের ফলে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনটি বাতিল করা হয়নি; প্রক্রিয়াগত কারণে এটি পরবর্তী অধিবেশনে বিল আকারে আনা হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ এবং পৃথক সচিবালয় গঠনের মতো বিষয়সহ মোট ৪টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংশ্লিষ্ট আরও ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত ‘শেলভড’ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাতিলের তালিকায় থাকা সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট তিনটি অধ্যাদেশের লক্ষ্য ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রধান বিচারপতির অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। এসব প্রস্তাবে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে দেওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে বিশেষ কমিটির সুপারিশে এসব সংস্কার বাতিলের মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে ২০টি অধ্যাদেশ নিয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা বিচার বিভাগ ও পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলে আপত্তি জানিয়েছেন।
সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সংশোধিত বিলগুলো আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) থেকে ধাপে ধাপে সংসদে উত্থাপন করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী, অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন বা বাতিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশেষ কমিটি, ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বহু সংস্কার এখন সংসদীয় আলোচনার মুখে পড়তে যাচ্ছে।