
মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন লিওনেল মেসি। সামনে হাজারো সমর্থক, পাশে লিওনেল স্কালোনি ও সতীর্থরা। কথা বলতে গিয়েই কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো আর্জেন্টাইন অধিনায়কের। দুই দশকের বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিন্ন করার মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। মেসির বিদায়ী ভাষণে তাই বারবার ফিরে এলো ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা আর আর্জেন্টিনার জার্সির স্মৃতি।
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বিদায়ী ম্যাচ শেষে সমর্থকদের উদ্দেশে কথা বলেন মেসি। শুরুতেই জানান, জাতীয় দলের হয়ে খেলা থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন। এই জার্সিতে মাঠে নামার সুযোগকে জীবনের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা বলতে গিয়ে মেসি স্মরণ করেন শুরুর দিনগুলো ও কঠিন সময়। ব্যর্থতা কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁকে কখনো জাতীয় দলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরাতে পারেনি বলে জানান। আর্জেন্টিনার হয়ে প্রতিটি মুহূর্তে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকাসহ একের পর এক শিরোপা জয়ের পেছনে সতীর্থদের অবদানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন মেসি। তাঁর ভাষায়, এই দলই তাঁকে শৈশবের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দিয়েছে। মাঠের বাইরেও সতীর্থদের সঙ্গে কাটানো সময়কে নিজের জীবনের বড় পাওয়া হিসেবে দেখেন তিনি।
সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও ছিল মেসির বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয় দলের খেলা দেখতে ছুটে আসা মানুষের ভালোবাসার কথা স্মরণ করেন তিনি। বিশ্বকাপ জয়ের পর দেশে ফিরে সমর্থকদের সঙ্গে উদযাপনের দিনটিকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতিগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন।
তবে বিদায়ের মুহূর্তে মেসির কণ্ঠে ছিল গভীর বিষণ্নতা। জাতীয় দলের জার্সি পরে আর মাঠে নামতে পারবেন না—এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া কঠিন বলে জানান তিনি। একপর্যায়ে বলেন, ‘আমি যেতে চাই না। আমি মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না।’
তবে বিদায় নিলেও আর্জেন্টিনার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না বলে স্পষ্ট করেন মেসি। ভবিষ্যতে গ্যালারির অন্য পাশে থেকে জাতীয় দলকে সমর্থন করার কথা জানান তিনি। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দেন।
দলের ঐক্যের ওপরও জোর দেন আর্জেন্টাইন তারকা। কঠিন সময় আসতেই পারে, তবে তখন আরও শক্তভাবে একে অন্যের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, একতাবদ্ধ আর্জেন্টিনাকে থামানো কঠিন।
সবশেষে নিজের পরিচয় নিয়েই সবচেয়ে আবেগঘন কথাটি বলেন মেসি। আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম নিতে পেরে তিনি গর্বিত এবং দেশের মানুষের সঙ্গে নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরে কৃতজ্ঞ—এ কথা জানিয়ে সমর্থকদের ভালোবাসা জানান।
ভাষণ শেষ হতেই করতালিতে ফেটে পড়ে মনুমেন্তাল। আতশবাজির আলোয় সতীর্থরা ঘিরে ধরেন মেসিকে। বিদায়ের সেই মুহূর্তে একদিকে ছিল একটি বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি, অন্যদিকে ছিল মেসি ও আর্জেন্টিনার মানুষের দীর্ঘ ভালোবাসার সম্পর্কের আরেকটি আবেগঘন অধ্যায়।