
বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন ও অত্যন্ত সংবেদনশীল এক পরিস্থিতি। শরীরে পুরুষ হরমোনের আধিক্য বা বৈজ্ঞানিক জটিলতার কারণে শাস্তির মুখে পড়তে যাচ্ছেন দেশের দুই শীর্ষ জাতীয় রেকর্ডধারী অ্যাথলেট—শটপুট ও জ্যাভলিন থ্রোয়ার জিন্নাত বেগম এবং স্প্রিন্টার কবিতা রায়।
দীর্ঘ এক বছর ধরে বিভিন্ন শারীরিক ও মেডিকেল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বোর্ড জানিয়েছে, দুই অ্যাথলেটের শারীরিক গঠন ও হরমোনের মাত্রা নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর ফলে অ্যাথলেটিক্স থেকে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ক্যারিয়ারজুড়ে অর্জন করা একাধিক সোনার পদকও হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন তারা।
হাসপাতালে বারবার পরীক্ষা, মেডিকেল রিপোর্টে কী এলো?
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড সম্প্রতি জিন্নাত ও কবিতার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সার্জারি, ইউরোলজি, গাইনি, এন্ডোক্রাইনোলজি ও সাইকোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত এই বোর্ড গত এক বছরে তাদের রক্ত ও হরমোন পরীক্ষা, আল্ট্রাসোনোগ্রাম, এক্স-রেসহ বিভিন্ন জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে।
বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, নারী বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে শরীরে পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে হয়। তবে পরীক্ষায় জিন্নাত ও কবিতা—দুজনের শরীরেই পুরুষ হরমোনের মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সীমার তুলনায় বহু গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে শারীরিক গঠন বা হরমোনজনিত এমন জটিলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঘটনা এটাই প্রথম। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এ ধরনের বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক থাকলেও এবারই প্রথম এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সে।
বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে
২০২৪ সালে জিন্নাত ও কবিতার নারী বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনী। দুই বাহিনীর অ্যাথলেটিক্স দলের মধ্যে এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে বিষয়টি বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের অ্যাপিল বোর্ড পর্যন্ত গড়ায়। পরে তাদের সুপারিশেই বিএমইউতে বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।
অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘গত এক বছরে তাদের অন্তত পাঁচবার হাসপাতালে নিয়ে নানা পরীক্ষা করানো হয়েছে। ডক্টররা তাদের সঙ্গে বারবার কথা বলেছেন। চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরির আগের বৈঠকেও দুই অ্যাথলেট উপস্থিত ছিলেন।’
দুই অ্যাথলেটের সোনালী ক্যারিয়ার
জিন্নাত বেগম (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী): ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে ৮টি সোনা, ২টি রূপা ও ১টি ব্রোঞ্জ জিতেছেন। ২০২৬ সালের জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে শটপুটে ১৪.২৫ মিটার দূরত্বে বল ছুড়ে নিজের গড়া জাতীয় রেকর্ডও ভেঙেছেন তিনি।
কবিতা রায় (বাংলাদেশ নৌবাহিনী): নৌবাহিনীর হয়ে রিলে দৌড়ে একের পর এক স্বর্ণপদক জিতেছেন। এর আগে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির হয়ে ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টেও পদক অর্জন করেছেন তিনি।
ফেডারেশন কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?
চূড়ান্ত মেডিকেল রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর শনিবার নির্বাহী কমিটির সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন। বিষয়টি জানিয়েছেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলী ইমাম তপন।
আন্তর্জাতিক নিয়মের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে এমন ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি আগের জেতা পদক কেড়ে নেওয়া হয়। গত জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে জিন্নাতকে এই শর্তেই নামতে দেওয়া হয়েছিল যে, মেডিকেল রিপোর্ট বিপক্ষে গেলে পদক বাতিল হবে। তাই শেষ আসরের ২টি সোনা ইতিমধ্যেই বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এখন তাঁদের আগের অর্জিত পদকগুলোর কী হবে, সেটাও সভায় ঠিক করা হবে।’
বর্তমানে ক্রীড়াবিশ্বে নারী ক্যাটাগরিতে ফেয়ার প্লে নিশ্চিত করতে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে। হরমোনজনিত এই অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতার কারণে ক্যারিয়ারের চরম সময়ে এসে দুই নারী অ্যাথলেটের স্বপ্ন থমকে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।