
সদ্য সমাপ্ত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অনলাইন ও গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার মোট ১১৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। এসব ভুল তথ্যের বড় অংশ বিভিন্ন দল, খেলোয়াড় ও ম্যাচকে কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে। এরপর রয়েছে স্পেন, ব্রাজিল, মিশর ও পর্তুগাল। খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন লিওনেল মেসি, লামিনে ইয়ামাল, নেইমার জুনিয়র ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও, ভুয়া মন্তব্য, পুরোনো ছবি-ভিডিও নতুন ঘটনার দাবিতে প্রচার, ভুয়া ফটোকার্ড এবং সার্কাজমভিত্তিক বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট উল্লেখযোগ্য হারে ছড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ–সংশ্লিষ্ট ২২টি ঘটনায় বাংলাদেশের ৭৮টি গণমাধ্যম মোট ১৪৩টি ভুল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা ভুল তথ্য বিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকাও সামনে এনেছে।
চলতি বছরের ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরের ১৬টি স্টেডিয়ামে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে ১১ জুন শুরু হওয়া ১০৪ ম্যাচের এই টুর্নামেন্ট ২০ জুলাই (বাংলাদেশ সময়) ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলের জয়ে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে স্পেন।
বিশ্বকাপজুড়ে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে নানা ছবি, ভিডিও, মন্তব্য ও তথ্য। তবে এর উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল বিভ্রান্তিকর, বিকৃত কিংবা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ম্যাচের ফলাফল, খেলোয়াড় ও দলকে ঘিরে গুজব, এআই দিয়ে তৈরি ছবি-ভিডিও, ভুয়া ফটোকার্ড, পুরোনো ছবি-ভিডিওকে নতুন ঘটনার দাবিতে প্রচার এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও খেলোয়াড়ের নামে ভুয়া মন্তব্য—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপজুড়ে ভুল তথ্যের বিস্তার ছিল উদ্বেগজনক।
আর্জেন্টিনাকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য
রিউমর স্ক্যানারের তথ্যমতে, শনাক্ত হওয়া ১১৩টি ভুল তথ্যের মধ্যে ৫২টি ছিল রানার্সআপ আর্জেন্টিনাকে ঘিরে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশই ছিল নেতিবাচক। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ২০টি ভুল তথ্য, যার ৮০ শতাংশই ইতিবাচক।
এ ছাড়া ব্রাজিলকে নিয়ে ১৬টি, মিশরকে নিয়ে ১৪টি এবং পর্তুগালকে নিয়ে ৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে পাওয়া ৬টি ভুল তথ্যের সবই দেশটির পক্ষে ছিল। মরক্কোকে নিয়ে ৪টি ভুল তথ্যের অর্ধেক ইতিবাচক হলেও নরওয়েকে নিয়ে ৪টি ভুল তথ্যের কোনোটিই তাদের পক্ষে ছিল না। একইভাবে ফ্রান্সকে নিয়ে শনাক্ত ২টি ভুল তথ্যের কোনোটিই ইতিবাচক ছিল না।
অন্যদিকে আলজেরিয়া, জাপান ও সুইজারল্যান্ডকে ঘিরে শনাক্ত হওয়া সব ভুল তথ্যই সংশ্লিষ্ট দলগুলোর পক্ষে ছিল। বিপরীতে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডকে নিয়ে শনাক্ত একটিও ভুল তথ্য ওই দলগুলোর পক্ষে যায়নি।
মেসিকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্য
খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে লিওনেল মেসিকে ঘিরে। তাকে নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ২২টি ভুল তথ্য, যার ৬৪ শতাংশ ছিল তার বিপক্ষে।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্পেনের লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে ১১টি ভুল তথ্যের ৮২ শতাংশ ছিল ইতিবাচক।
এ ছাড়া নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে ৮টি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে ৬টি এবং আর্লিং হালান্ডকে নিয়ে ৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
কিলিয়ান এমবাপে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ভার্জিল ভ্যান ডাইক, টনি ক্রুস, ওরইয়ান নিল্যান্ড, জুড বেলিংহাম, ব্রুনো গিমারায়েস ও লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নিয়ে প্রচারিত ভুল তথ্যের কোনোটিই তাদের পক্ষে ছিল না।
অন্যদিকে গনসালো রামোস, ইয়াসিন বুনু, আইসা মান্দি, মোহাম্মদ মোহেবি ও মোহাম্মদ সালাহকে নিয়ে শনাক্ত হওয়া সব ভুল তথ্যই সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়দের পক্ষে ছিল।
কোচ ও সাবেক তারকারাও রেহাই পাননি
ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন বিভিন্ন কোচ ও সাবেক ফুটবলারও। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি, মিশরের কোচ হোসাম হাসান, সাবেক পর্তুগাল কোচ ফের্নান্দো সান্তোস ও সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিনকে নিয়ে প্রচারিত ভুল তথ্যের কোনোটিই তাদের পক্ষে ছিল না।
সাবেক ফুটবলারদের মধ্যে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, মেসুত ওজিল ও জিনেদিন জিদানকে নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। তবে ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাকাকে নিয়ে প্রচারিত একমাত্র ভুল তথ্যটি ছিল তার পক্ষে।
৭৮ গণমাধ্যমে ১৪৩টি ভুল প্রতিবেদন
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বকাপ–সংশ্লিষ্ট ২২টি ঘটনায় দেশের ৭৮টি গণমাধ্যম মোট ১৪৩টি ভুল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সবচেয়ে বেশি ৬টি ভুল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মাছরাঙা টেলিভিশন। এরপর কালবেলা প্রকাশ করেছে ৫টি। ইত্তেফাক, সময়ের আলো, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ক্রিকফ্রেঞ্জি এবং দ্য নিউজ প্রকাশ করেছে ৪টি করে ভুল প্রতিবেদন।
ফাইনাল ম্যাচ ঘিরেই সবচেয়ে বেশি গুজব
ম্যাচভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ২২টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালকে ঘিরে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাউন্ড অব ১৬-এর মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ, যাকে কেন্দ্র করে শনাক্ত হয়েছে ২০টি ভুল তথ্য।
এ ছাড়া স্পেন-পর্তুগাল ও ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচকে ঘিরে ৩টি করে এবং ব্রাজিল-মরক্কো, আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্স-স্পেন ম্যাচকে ঘিরে ২টি করে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
এআই-নির্ভর ভুয়া ছবি-ভিডিওর আধিক্য
বিশ্বকাপ চলাকালে মাঠের ঘটনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর কনটেন্টও ছড়ানো হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানারের হিসাবে—
মাঠের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ভুল তথ্য: ১৬টি
ভুয়া ফটোকার্ড: ৭টি
সার্কাজমভিত্তিক বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট: ৭টি
বাংলাদেশকে জড়িয়ে প্রচারিত ভুল তথ্য: ২১টি
এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও: ৩৩টি
পুরোনো ছবি-ভিডিও নতুন ঘটনার দাবিতে প্রচার: ১৭টি
ভুয়া পেজ থেকে প্রচারিত ভুল তথ্য: ৪টি
৩৩ ব্যক্তির নামে ছড়ানো হয়েছে ভুয়া মন্তব্য
বিশ্বকাপ চলাকালে ৩৩ জনের নামে মোট ৩৮টি ভুয়া মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।
এর মধ্যে বাংলাদেশের ৬ জন, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১৩ জন ফুটবলার এবং অন্যান্য ১৪ জন ব্যক্তির নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে।
খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪টি ভুয়া মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে লামিনে ইয়ামালের নামে। এছাড়া লিওনেল মেসি ও জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের নামে ২টি করে ভুয়া মন্তব্য শনাক্ত হয়েছে।
সূত্র: রিউমর স্ক্যানার