
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি কারখানায় চলমান অস্থিরতার নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন বা নাশকতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পারওয়ার বলেছেন, নতুন মজুরি আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন তিনি।
গোলাম পারওয়ার বলেন, শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা, লুটপাট ও উৎপাদন ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
তিনি বলেন, চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগসহ কোনো রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। তবে কোনো প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী করা যাবে না।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, একের পর এক কারখানা বন্ধ এবং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু শ্রমিক-মালিক বিরোধের বিষয় নয়; এটি শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় সংকট।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে গোলাম পারওয়ার বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় শ্রমিকদের আয় ও জীবনমানের উন্নতি হয়নি। একজন শ্রমিকের মাসিক আয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার। শ্রমিকের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠলেও তাদের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে জানিয়ে গোলাম পারওয়ার বলেন, ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দেবে বলে তিনি আশা করেন।
প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের পথ পরিহার করার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ১২ দফা দাবি তুলে ধরেন গোলাম পারওয়ার। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করা।
গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
এ ছাড়া কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নাশকতায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা; শ্রমিকদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ; গ্রেপ্তার নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি রয়েছে।
রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ে শ্রমিকদের ওপর হামলা ও হয়রানি বন্ধ, শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার এবং সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যকর সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের উসকানি, ষড়যন্ত্র বা নাশকতার অপচেষ্টা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রতিরোধের দাবি করেন।
বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু, শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কাজে ফিরিয়ে নেওয়া, অন্যায়ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে পুনরায় কাজের সুযোগ দেওয়ার দাবিও তুলে ধরেন গোলাম পারওয়ার। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইমসহ অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধের আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া শ্রমিকদের জন্য ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নারী শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।