
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তি মূলত দেশ তিনটির নিজস্ব নিরাপত্তার প্রয়োজন থেকে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। তাঁর মতে, মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে ধরনের কাঠামো প্রয়োজন, এই চুক্তিতে তার প্রতিফলন নেই। এতে সামগ্রিকভাবে মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ কতটা রক্ষা পাবে, তা নিয়েও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এই চুক্তিতে যুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে আবেগের বশবর্তী না হয়ে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সৌদি আরবে বাংলাদেশি সেনাসদস্য পাঠানোর বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনার প্রয়োজন বলে মনে করেন সাবেক এই কূটনীতিক। তাঁর মতে, প্রয়োজনে মক্কা চুক্তিতে যুক্ত না হয়েও সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর এফডিসিতে মুসলিম বিশ্বের সংকট মোকাবিলায় মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে আয়োজিত এক ছায়া সংসদ বিতর্ক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
এম হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ সৌদি আরবের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে দেশের শ্রমবাজার এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে অংশ নিলে ভারত, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কেন্দ্র করে পাল্টা একটি শক্তিশালী জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও দেখছেন তিনি। এমন পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল উল্লেখ করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, হুতিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং তাদের পারস্পরিক মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এ সংঘাতের টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানরা নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি ও অধিকারহীনতার শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ, শিয়া-সুন্নি বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড মুসলিম বিশ্বের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলছে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এবং ইসলামি সামরিক সন্ত্রাসবিরোধী জোটের (আইএমসিটিসি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের ভাষ্য, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ ও পারস্পরিক বিরোধকে কাজে লাগিয়ে ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলো ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিরোধী পক্ষগুলো এসব বিভাজনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এমনকি মুসলিমবিদ্বেষী বিভিন্ন গণমাধ্যম ইসলামকে সহিংসতা ও উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করছে।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম দেশগুলো নিজেদের মধ্যকার বিভেদ দূর করে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারলে ইসলামবিদ্বেষীদের অপপ্রচার ও নেতিবাচক প্রচারণা অনেকটাই ভেঙে পড়বে। এমন বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্বের সংকট মোকাবিলায় মক্কা চুক্তি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সেটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মক্কা চুক্তির আওতাভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নেতাদের তেহরানে আলোচনা চলার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত বন্ধের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই গত দুই দিনে ইয়েমেন ও হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে সৌদি আরবের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা নতুন করে বেড়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, মক্কা চুক্তির প্রতি বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে দেশের শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারণ করা যায়, সৌদি বিনিয়োগ বাড়ানো যায় এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অগ্রগতি অর্জন করা যায়, তা বিবেচনা করতে হবে। কোনো উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আগে সেখান থেকে বাংলাদেশের কী ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব, সেটিও নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বিতর্কে আনন্দ মোহন কলেজের জয়
‘মুসলিম বিশ্বের বিদ্যমান সংকট নিরসনে মক্কা চুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সরকারি দল হিসেবে অংশ নেয় ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকরা। অন্যদিকে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব করে একই শহরের আনন্দ মোহন কলেজ।
প্রতিযোগিতায় সরকারি দলকে পরাজিত করে বিজয়ী হয় বিরোধী দল আনন্দ মোহন কলেজের বিতার্কিকরা।
প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, সাংবাদিক মাঈনুল আলম, সাংবাদিক এ কে এম মঈনুদ্দিন, সাংবাদিক ইমরুল কায়েস এবং সাংবাদিক শাতিলা শারমিন।
বিতর্ক শেষে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর হাতে ট্রফি, ক্রেস্ট এবং সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। পুরো ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।