
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা একটি কালো মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্য অনুসরণ করে টঙ্গীর তুরাগ নদের মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। তাহসিফের মরদেহ যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় এটি পড়ে ছিল।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। এদিন দীপকে সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকাটি পরিদর্শন করেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, দীপের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালিয়ে কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মডেলের একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধার করা যানটি তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নয় তদন্ত সংস্থা। এ জন্য মোটরসাইকেলটির কাগজপত্র, ঘটনাস্থলে এর অবস্থান, মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে দূরত্ব এবং দীপের বর্ণিত সময়ের সঙ্গে অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সবকিছুই তদন্তকারীরা সরাসরি সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন না। প্রতিটি তথ্য প্রযুক্তিগত সহায়তায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এ পর্যায়ে সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করাও সম্ভব নয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন গণমাধ্যমকে মোবাইল ফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীপ দাবি করেন, গত ২৭ অক্টোবর রাতে তিনি তাহসিফের সঙ্গে দুটি পৃথক মোটরসাইকেলে বের হয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে তাহসিফের বাসায় গিয়ে বিকল হয়ে থাকা তার মোটরসাইকেলটি চালু করতে সহায়তা করেন তিনি। পরে মোটরসাইকেলটি একটি ওয়ার্কশপে নিয়ে মেরামত করানো হয় এবং তেল পরিবর্তন করা হয়। কাজ শেষে দুজন উত্তরার রুআপ শপিং কমপ্লেক্সে অবস্থিত কুকরুক্কু রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান।
দীপের বর্ণনা অনুযায়ী, খাবার শেষে তারা একসঙ্গে রেস্তোরাঁ থেকে বের হন। পরে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় গিয়ে আলাদা হয়ে যান। রাত ১২টার দিকে তাহসিফের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি নিজের বাসায় ফিরে যান বলে দাবি করেন দীপ। তবে পিবিআইয়ের কাছে পরবর্তী সময়ে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, ওই রাতে আরও পরে তারা টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, দীপের দেওয়া তথ্য থেকেই ওই এলাকায় মোটরসাইকেলটির সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পান তারা। এরপর অভিযান চালিয়ে সেটি উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটির কোনো নম্বর প্লেট পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফকে যে মোটরসাইকেলে বের হতে দেখা গেছে, সেটিতেও নম্বর প্লেট ছিল না।
মোটরসাইকেলটি কীভাবে ওই এলাকায় পৌঁছাল, সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পিবিআই। দীপের দাবি, গভীর রাতে ওই এলাকায় পুলিশের পোশাক পরা দুজন ব্যক্তিকে দেখে তারা দৌড়ে পালিয়ে যান। তবে পোশাকধারী ওই ব্যক্তিরা সত্যিই পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্ত সংস্থা।
এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনকে দেখে তারা দৌড় দেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ওই সময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশের কোনো সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে ঘটনার রাতে দীপ কখন বাসায় ফিরেছিলেন, তা নিয়েও অনুসন্ধান চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা। দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত আড়াইটার পর তিনি বাসায় পৌঁছান। এর আগে তিনি কোথায় ছিলেন এবং তাহসিফের সঙ্গে কখন তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, তা প্রযুক্তির সহায়তায় যাচাই করা হচ্ছে।
তাহসিফের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনার ফল, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পিবিআই।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগের দিন থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। নিখোঁজ হওয়ার আগে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দীপের সঙ্গে মোটরসাইকেলে বের হতে দেখা যায়। পরে তাহসিফের পরিবারের সদস্যরা ফুটেজে থাকা যুবককে দীপ বলে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পিবিআই। এরপর থেকে তার দেওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। শুক্রবার পর্যন্ত তাহসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো মামলা করা হয়নি কিংবা লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়নি।