
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জীবনবৃত্তান্তে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার কমিশন এ অনুমোদন দেয়। শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান রোববার এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য জমা দেওয়া সিভিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) অনারারি ওয়েলফেয়ার স্পেশালিস্ট বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য ও যোগ্যতার উল্লেখ করেছিলেন পুতুল। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রের সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং অপরাধমূলক অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রের অনুমোদন
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এ অভিযোগে গত বছরের ২০ মার্চ পুতুলের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়। মামলাটির তদন্ত শেষে দুদকের উপপরিচালক তাহাসিন মুনাবীল হক প্রতিবেদন জমা দেন। সেটি পর্যালোচনা করে কমিশন অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দেয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেওয়ার সম্মতি দিয়ে নিবন্ধন নিয়েছিলেন পুতুল।
দুদকের অভিযোগ, ওই পদে দায়িত্বে থাকার সময় ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে অনারারি ওয়েলফেয়ার স্পেশালিস্ট বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার বিষয়ে প্রতারণামূলকভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দেন তিনি।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, এসব তথ্য ব্যবহার করে পুতুল ক্ষমতার অপব্যবহার করেন এবং রাষ্ট্রের সুনাম ক্ষুণ্ন করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথি খোলা ও তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই চাপ প্রয়োগ করে সংশ্লিষ্ট তথ্য ডব্লিউএইচওর দপ্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে দুদক। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তরে তথ্য পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তথ্যের ভিত্তিতেই পুতুল ওই পদে নিয়োগ পান। কমিশনের মতে, তাঁর এ কর্মকাণ্ড দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
যোগ্যতা, নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ
দুদক জানিয়েছে, আঞ্চলিক পরিচালক পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য পুতুলের দেওয়া যোগ্যতাসংক্রান্ত তথ্য যথাযথ ছিল না বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কমিশনের অভিযোগ, মনোনয়নের সময় তিনি কানাডার পাসপোর্টধারী ও দেশটির নাগরিক ছিলেন।
এ ছাড়া ডব্লিউএইচওর ৭৬তম সম্মেলনে যোগ দিতে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের দিল্লিতে বাংলাদেশ থেকে শতাধিক কর্মকর্তা ও প্রতিনিধির অংশগ্রহণের বিষয়টিও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের দাবি, এ ক্ষেত্রে পুতুল তাঁর পারিবারিক প্রভাব এবং নিকটাত্মীয়দের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারের বিপুল অর্থের ক্ষতি করেছেন।
পূর্বাচলে প্লট ও সূচনা ফাউন্ডেশন ঘিরে অন্য অভিযোগ
দুদক জানিয়েছে, পৃথক একটি অভিযোগের অনুসন্ধানে পুতুলের বিরুদ্ধে ঢাকার পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পের কূটনৈতিক এলাকায় ১০ কাঠার প্লট বেআইনিভাবে বরাদ্দ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। কমিশনের অভিযোগ, দুর্নীতি এবং পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি ওই প্লট বরাদ্দ নেন। এ ঘটনায় পুতুলসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একটি মামলা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে জোর করে উপঢৌকন আদায় এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন অটিস্টিক সেলকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।
কমিশনের আরও অভিযোগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে প্রভাব খাটিয়ে সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে প্রাপ্য অর্থ করমুক্ত করিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে বলে জানিয়েছে দুদক।