
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ এবং বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার সুনিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার, তল্লাশি বা জিনিসপত্র জব্দ করার পাশাপাশি ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তে প্রবেশ ও নজরদারির মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
আইনটি সংশোধন ও চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ১২ দফা সুপারিশে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগে মোবাইল কোর্ট ও নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ বন্ধ, মানহানির অভিযোগ প্রেস কাউন্সিলে পাঠানো, সংবাদসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অনলাইন কনটেন্ট অপসারণে স্বচ্ছতা ও বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
সম্পাদক পরিষদের মতে, সাইবার অপরাধ দমনের কার্যকর ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ এবং সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় আইনে স্পষ্ট বিধান থাকা জরুরি।
জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার দাবি
সম্পাদক পরিষদ বলেছে, জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ কিংবা মতামত কেবল তার বিষয়বস্তু বা সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। ন্যায্য সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য, রম্যরচনা, কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র, প্যারোডি এবং ভোক্তার অভিযোগের মতো বৈধ মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও আইনি সুরক্ষা থাকতে হবে।
সংগঠনটির সুপারিশ, অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না। মতপ্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধকে অজামিনযোগ্য করার বিধানও রাখা উচিত নয়।
ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে সেগুলোর পৃথক সংজ্ঞা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। কোনো তথ্য যাচাই করা হয়নি কিংবা তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই—শুধু এ কারণে সেটিকে অপরাধের উপাদান হিসেবে বিবেচনা না করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বুলিং, মানহানি, কাউকে হেয় করা, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্য, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ করা, যৌন হয়রানি এবং সেক্সটর্শনের মতো বিষয়গুলো আইনে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশের ক্ষতি, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার, সরকারি ব্যয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশও রয়েছে।
সরকারের সমালোচনায় ফৌজদারি বিধান প্রয়োগ না করার প্রস্তাব
সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি নীতির সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত, বিশ্লেষণ, ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপাত্মক বক্তব্যকে সাইবার অপরাধের আওতায় না আনার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
সংগঠনটি মনে করে, ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ আইনে রাখা উচিত নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ করার মতো অভিযোগের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রয়োজন। সাংবাদিকতা, গবেষণা, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের কাজকে এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কনটেন্ট সরাতে লিখিত কারণ ও আদালতের পর্যালোচনা
অনলাইন থেকে কোনো কনটেন্ট সরানো বা বন্ধ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, লিখিত আদেশ এবং পদক্ষেপটি কেন প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দিতে হবে।
এ ধরনের আদেশের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাধীন কর্তৃপক্ষ কিংবা আদালতে আপিল এবং বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে কোনো কনটেন্ট বন্ধ করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের অনুমোদন নেওয়া অথবা বিচারিক পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার সিদ্ধান্তসংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের সুপারিশ করা হয়েছে।
মানহানির অভিযোগে নতুন ও কঠোর সাইবার অপরাধের বিধান তৈরি না করে বিদ্যমান কাঠামোর আওতায় বিষয়গুলো প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ, মানহানি কিংবা সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তি মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে না করারও সুপারিশ করেছে তারা।
সংবাদমাধ্যম বন্ধ বা সাংবাদিকের সূত্র প্রকাশে বাধা
কোনো প্রতিবেদন বা প্রকাশনার কারণে একটি সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক কার্যক্রম বন্ধ করা, নিবন্ধন বাতিল কিংবা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক শাস্তির মুখে ফেলার বিরোধিতা করেছে সম্পাদক পরিষদ। এ ধরনের অভিযোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রেস কাউন্সিলকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা উচিত নয়। সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের পেশাগত কাজ নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অভিযোগের ধরন অনুযায়ী প্রথমে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের অভিযোগ গ্রহণ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া কার্যকর করা প্রয়োজন।
এ জন্য সংবাদপত্রের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকেও প্রেস কাউন্সিলের আওতায় আনতে প্রতিষ্ঠানটির এখতিয়ার ও কার্যকারিতা আধুনিক করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
সাইবার আইন প্রয়োগে স্বাধীন তদারকির দাবি
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলকে আরও বহুপক্ষীয় ও স্বাধীন তদারকির উপযোগী করার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সাইবার আইনের অধীনে তদন্ত, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি এবং কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
প্রস্তাবে কাউন্সিলে সাইবার নিরাপত্তা, আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গণমাধ্যম এবং সম্পাদকীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ রয়েছে।
সম্পাদক পরিষদের পর্যবেক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ দমন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সাংবাদিকতা—এই তিনটি পৃথক বিষয়। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর সীমারেখা স্পষ্ট নয়। এতে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথে বাধা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে প্রস্তাবিত আইনটি পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সম্পাদক পরিষদের মতে, স্বচ্ছতা, বিচারিক তদারকি, জবাবদিহি এবং কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তা থাকলেই ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব সাইবার আইন প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমনের পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে। সংগঠনটির বক্তব্য, নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্বাধীন গণমাধ্যম পরস্পরের বিরোধী নয়; যথাযথ আইন ও সুরক্ষার মাধ্যমে দুটিকেই শক্তিশালী করা সম্ভব।