
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায় সরকার। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হলে সেটি কোনো বহুপক্ষীয় সফরের অংশ না হয়ে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, গত ১৫ বছরের ধারাবাহিকতা থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে বের করে নতুন একটি ভিত্তি তৈরি করতে চায় সরকার। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সই করা ১০১টি চুক্তি পুনর্নিরীক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব চুক্তি যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি চিফ হুইপের আওতাধীন হওয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তার কাছ থেকেই জানা যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেবেন। এবারের সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও একটি বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, আপনার প্রশ্নটি সঠিক হয়নি। ভারত নিয়ে মুগ্ধতা (ফেসিনেশন) থেকে বের হয়ে আসুন। ভারত কেবল আরেকটি প্রতিবেশী দেশ, যার সঙ্গে আমরা ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চাই। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার—সব সময় খালি ভারতের কথাই ভাবলে চলবে না। নিজের দেশের কথা ভাবুন। যার সঙ্গে যখন দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক কথা বলা দরকার, আমরা অবশ্যই তা বলব। কিন্তু সাইডলাইনে সবার সঙ্গে তো আর দেখা করা সম্ভব নয়। তবে আমাদের অনেক নিমন্ত্রণ থাকবে এবং অনেক দেশের সঙ্গে আলোচনা হবে।
এদিকে আগামী জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সম্প্রতি ওই পদ থেকে পদত্যাগ করা সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের পরিবর্তে বাংলাদেশ নতুন কোনো প্রার্থী দেবে কি না—এমন প্রশ্নে তার নিয়োগ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
হুমায়ুন কবির বলেন, ওই পদে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নিয়োগটিই ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিতর্কিত। এমন একটি উচ্চপর্যায়ের পদের জন্য তার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা কিছুই ছিল না। একটি স্বৈরাচারী সরকার স্বজনপ্রীতি করে তাকে সেই পদে বসিয়েছিল। আপনারা জানেন, ওই পুরো পরিবারের দুর্নীতি ও জালিয়াতির খবর এখন একটির পর একটি সামনে আসছে। সুতরাং তার নিয়োগ নিয়ে তদন্ত হওয়া মোটেও বিস্ময়কর নয়। স্বৈরাচারী আমলে জালিয়াতি, তথ্য গোপন ও প্রভাব খাটিয়ে তাকে ওই পদে বসানো হয়েছিল।
দুর্নীতির গন্ধ কখনো চেপে রাখা যায় না উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এটি প্রকাশ পাবেই। শেখ মুজিব পরিবারের দুর্নীতির দুর্গন্ধ এখন এতটাই স্পষ্ট যে মানুষ সব জায়গায় তা চিনতে পারছে। সুতরাং কোনো যোগ্যতা ছাড়া কেবল বিশেষ পরিবারের সন্তান ও তৎকালীন তথাকথিত প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় এই পদ বাগিয়ে নেওয়াটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থায় রাজনৈতিক বা পারিবারিক প্রভাবের ভিত্তিতে নিয়োগের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, কেবল রাজপরিবার বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে কাউকে এত বড় পদে বসানো উচিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে হাস্যকর বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়—যে সংস্থাটি বিশেষ করে কোভিড মহামারির সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কঠোর করার ওপর জোর দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, বিতর্ক ও দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা উচিত নয়। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নেতৃত্ব প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে যোগ্য প্রার্থীকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, মালদ্বীপের সম্ভাব্য প্রার্থীর মতো ভালো ট্র্যাক রেকর্ড ও যোগ্যতা থাকা ব্যক্তিদের বিবেচনা করা যেতে পারে। তার আশা, ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ নেতৃত্বের অধীনেই পরিচালিত হবে।