
বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। তাই আয়, অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়।
রোববার রাজধানীর নভোথিয়েটারের প্লেনারি হলে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এর ‘হেলথ ইনোভেশন ফর অল: এক্সপান্ডিং অ্যাকসেস টু অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ কেয়ার’ শীর্ষক প্লেনারি আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এ মেলার আয়োজন করে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, অনেক রোগী শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়ার পর বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। বাড়ির কাছাকাছি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না থাকায় তাদের দূর-দূরান্তে যেতে হয়। এতে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগ অনেক সময় হাতছাড়া হয়ে যায়।
তিনি বলেন, আধুনিক ও উচ্চতর চিকিৎসা ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমরা প্রায়ই বলি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। এটি সত্য। তবে রোগ ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই তা শনাক্ত করাও অত্যন্ত জরুরি।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. জুবাইদা বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকার মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য যেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে না হয়। একইভাবে হাম আক্রান্ত শিশুদের বাবা-মায়েরও বাড়ির কাছেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকা দরকার।
তিনি বলেন, প্রতিটি স্ক্রিনিং কর্মসূচির সঙ্গে রোগ নির্ণয়, পরামর্শ, চিকিৎসা, ওষুধ, পর্যবেক্ষণ ও রেফারেলের নিশ্চিত ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু রোগ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়, শনাক্ত রোগীর পরবর্তী চিকিৎসা নিশ্চিত করাও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব।
স্বাস্থ্যসেবার এই কাঠামো একটি সুস্পষ্ট নীতির ভিত্তিতে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে ডা. জুবাইদা বলেন, মানসম্মত চিকিৎসা আয়, অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল কোনো বিশেষ সুবিধা হওয়া উচিত নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য হতে হবে।
এ লক্ষ্য অর্জনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, মানুষের বাড়ির কাছাকাছি চিকিৎসার সুযোগ তৈরি, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
বিশেষ করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন ডা. জুবাইদা। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কমিউনিটি পর্যায়ে এসব স্বাস্থ্যকর্মী স্ক্রিনিং, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর কাজে সহায়তা করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগীদের নির্বিঘ্নে স্থানান্তরের জন্য কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একজন রোগী কোথা থেকে কোথায় এবং কী ধরনের চিকিৎসার জন্য যাবেন—এ বিষয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা থাকলে স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
স্বেচ্ছায় রক্তদান ও নিরাপদ রক্ত সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা। তিনি বলেন, সংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং, রক্তের বিভিন্ন উপাদান পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহন এবং রক্তদাতা থেকে রোগী পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণযোগ্য রাখতে জাতীয়ভাবে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উদ্ভাবন মানেই সবসময় ব্যয়বহুল যন্ত্র তৈরি বা নতুন কোনো অ্যাপ চালু করা নয়। মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানো যায় এবং কম খরচে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়—এমন পদ্ধতিও উদ্ভাবনের অংশ।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক এ কে আজাদ খান।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) মহাপরিচালক (ডিজি) আলমগীর হোসেন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এম মোসাদ্দেক হোসেন, টিএমএসএসের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডা. মতিউর রহমান, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আকতার হোসেন, ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের মেডিকেল সার্ভিসেস পরিচালক ডা. আজহারুল ইসলাম খান এবং এসকেজেন লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. সাদাফ সাজ সিদ্দিকী।