
চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে চার মামলায় মোট ২০ দিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেও তাঁর অস্ত্রভান্ডারের সন্ধান পায়নি পুলিশ। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে ইমন বেশ কিছু ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ দিয়েছেন। যদিও সেই তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করতে রাজি হননি তারা।
গত ২৯ জুলাই যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে ফটিকছড়ি থানার দুটি অস্ত্র মামলা ও একটি হত্যা মামলায় ১৫ দিন এবং হাটহাজারী থানার একটি চাঁদাবাজির মামলায় পাঁচ দিন—সব মিলিয়ে ২০ দিন রিমান্ডে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
সবশেষ ফটিকছড়ি থানার একটি অস্ত্র মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ইমনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। একই মামলায় তাঁর সহযোগী মো. ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াস, শামীমসহ আরও চারজনেরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত।
এদিন নগর পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চান্দগাঁও থানার শমসের পাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন তাহসিনকে গুলি করে হত্যার মামলায় ইমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা সাত্তারের আদালত এ আদেশ দেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার নেতৃত্বে থাকা দুজনের একজন ডেভিড ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান নেতৃত্বে আসেন। রায়হানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
ইমনের জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁর কাছে ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্য রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ ছিলেন বলেও পুলিশের কাছে তথ্য আছে। গ্রেপ্তারের আগে চট্টগ্রামে অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে একাধিক হত্যাকাণ্ড এবং চাঁদা না পেয়ে নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসায়ীদের বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল রাখার পেছনে ইমনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফলে চার মামলায় ২০ দিনের রিমান্ডের পরও তাঁর অস্ত্রভান্ডারের সন্ধান না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে গত ১২ আগস্ট হাটহাজারী থানার চাঁদাবাজির মামলায় ইমনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পরদিনই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাকে সন্দ্বীপ থানায় বদলি করা হয়। রিমান্ড শুরুর পরপরই তদন্ত কর্মকর্তার বদলি এবং দীর্ঘ ২০ দিন জিজ্ঞাসাবাদের পরও অস্ত্রভান্ডারের অবস্থান শনাক্ত না হওয়াকে সংশ্লিষ্টরা রহস্যজনক বলে মনে করছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে পুলিশি পাহারার মধ্যেই চট্টগ্রাম নগরের শীর্ষ ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে সাবমেশিনগান, চায়নিজ রাইফেল, শর্টগান ও পিস্তল দিয়ে এক ডজনের বেশি গুলি ছোড়া হয়। চাঁদা না দেওয়ায় বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ হামলা চালিয়েছিল বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্রও ঘটনায় ডেভিড ইমনের সম্পৃক্ততার কথা নিশ্চিত করেছে।
ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী থানার হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির চার মামলায় ২০ দিনের রিমান্ডে ইমনের অস্ত্রভান্ডার সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া গেছে, জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, রিমান্ডে ইমনের কাছ থেকে অস্ত্রভান্ডারের বিষয়ে তথ্য পাওয়া না গেলেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ভবনমালিকের কাছ থেকে মাসে গড়ে প্রায় ১ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য মিলেছে। কার কার কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হতো, সে সম্পর্কেও ইমন তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আদায় করা চাঁদার অর্ধেক বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর কাছে পাঠানো হতো। বাকি অর্থ নিজের কাছে রাখতেন ডেভিড ইমন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তাঁর দলে যুক্ত হন ইমন। সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসেবে উঠে আসেন ইমন।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আলোচনায় আসেন মোবারক হোসেন ইমন। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি মামলা রয়েছে।
ডেভিড ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায়। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানে প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন এবং কয়েক বছর আগে মারা যান।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের দাবি, গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যার মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে ইমনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩০ জুলাই ভোরে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং আরও কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।