
জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি মূল বেতন, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন, বাস্তবায়নের ধাপ এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিসহ একাধিক বিষয় নিয়ে এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্র জানায়, সচিব কমিটি আরও দুই থেকে তিনটি বৈঠক শেষে চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিতে পারে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের পথ খুলবে। তবে ঠিক কবে এই প্রক্রিয়া শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি নেই।
প্রশাসনিক সূত্রগুলোর মতে, অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি আরও সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তাদের বেতন-ভাতার জন্য প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার আগে সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয়, গ্রেড বিন্যাস, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বিভিন্ন ভাতা এবং পেনশনের ওপর প্রভাবসহ সব বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা অর্থ বিভাগের যাচাই শেষে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই গেজেট প্রকাশ এবং বাস্তবায়ন প্রজ্ঞাপন জারি করা সম্ভব হবে।
সরকারের বিবেচনায় থাকা একটি বিকল্প পরিকল্পনা হলো প্রথম ধাপে শুধু নতুন মূল বেতন কার্যকর করা এবং পরবর্তী সময়ে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা সমন্বয় করা। কারণ মূল বেতন বৃদ্ধি পেলে শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যয়ই নয়, উৎসব ভাতা, গ্র্যাচুইটি, পেনশন ও অবসর-সুবিধার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
নতুন পে-স্কেল নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। মূল বেতন বাড়লে পেনশন কীভাবে সমন্বয় হবে, সর্বনিম্ন পেনশন বৃদ্ধি পাবে কি না এবং পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের সুবিধার পার্থক্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেসব বিষয়ও চূড়ান্ত প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। তবে অর্থ বিভাগ এখনো এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট হার বা নীতিমালা প্রকাশ করেনি।
প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থা (আইবাস++) সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা, কর ও পেনশনের হিসাব পরিচালিত হয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সফটওয়্যারে নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স সংযোজন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান বেতন নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং সার্ভিস রেকর্ড হালনাগাদের মতো কাজও সম্পন্ন করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পৃথক সরকারি নির্দেশনা বা আইবাস সার্কুলার জারি হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি কমিশনের সুপারিশ এবং অষ্টম পে-স্কেলের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করছে। আরও দুই থেকে তিনটি কারিগরি বৈঠকের পর কমিটি তাদের সুপারিশ মন্ত্রিসভায় পাঠাবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী আগস্টের মধ্যে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হবে এবং সরকারি চাকরিজীবীরা বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাবেন।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়ের দাবি। তবে একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’