
সরকারি কর্মকর্তাদের মেধা, কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে স্বীকৃতি জানাতে ২০১৬ সালে প্রবর্তন করা হয়েছিল জনপ্রশাসন পদক। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে তা ‘বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদক’ নামে নতুন রূপ পেলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর পদকটি ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিতর্কের। পদক প্রদান ও নাম বহাল রাখা নিয়ে বর্তমানে তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং অস্বস্তিতে পড়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আগের নামে পদক দেওয়া কিংবা পদক পুরোপুরি স্থগিত করা—উভয় সিদ্ধান্তেই ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই জটিলতায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ফলে টানা দুই বছর ধরে জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবসের রাষ্ট্রীয় সব আয়োজন বন্ধ রয়েছে। পদকের নাম পরিবর্তন করে পুনরায় চালু করা, আগের পদকপ্রাপ্তদের সম্মাননা বাতিল বা নীতিমালায় নতুন রূপরেখা যুক্ত করা নিয়ে প্রশাসনের নীতিনির্ধারকরা এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সমকালকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সিপিটি অনুবিভাগ) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন:
"যতক্ষণ নীতিমালা বাতিল বা পরিবর্তন হচ্ছে না, সে পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। তবে দিবসটি কীভাবে পালন করা হবে, এ বিষয়ে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে।"
দিবস থাকলেও থমকে আছে আনুষ্ঠানিকতা
বিশ্বজুড়ে ২৩ জুলাই জাতিসংঘ ঘোষিত 'জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস' মহাসমারোহে উদযাপিত হলেও এবার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। আজ বৃহস্পতিবার দিবসটি উপলক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি রাখা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে পদকের নামটাই সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবর্তন না করে পদক বিতরণ করলে যেমন সমালোচনা হবে, তেমনি নাম পরিবর্তন করলেও সেটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হতে পারে। তাই আপাতত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
২০১৭ সালে এই পদক বিজয়ী ও প্রাক্তন অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী মনে করেন, আমলাদের কাজের উদ্দীপনা ধরে রাখতে এমন সম্মাননা বহাল থাকা উচিত। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান যুগে নাগরিক সেবা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় পদকের নীতিমালাকে দ্রুত যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ২০৪ জন কর্মকর্তা ও ১৫টি সংস্থা এই পদক লাভ করেন। এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে ‘বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদক’ দেওয়া হয় ৫৬ জন ব্যক্তি ও ৫টি সংস্থাকে। একক অবদানের জন্য স্বর্ণপদক, সনদ ও ক্রেস্টের পাশাপাশি দুই লাখ টাকা এবং দলগত সাফল্যের জন্য পাঁচ লাখ টাকা অর্থপুরস্কার দেওয়া হতো।
তবে নাম পরিবর্তনের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করে পদকপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, নামটির কারণে তাঁর কর্মজীবনে এই স্বীকৃতি এখন একপ্রকার গ্লানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ আগের নামটি থাকলে এটিই হতো তাঁর সবচেয়ে বড় সম্মানের স্মারক।
উপাধি ‘বিপিএএ’ ব্যবহারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
পদকের নীতিমালা এখনও রহিত বা পরিমার্জন না হওয়ায় অনেকে নামের পাশে পদবীর উপাধি ‘বিপিএএ’ (বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদক) ব্যবহার করে যাচ্ছেন। বুধবার সরকারি ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা যায়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব গোলাম রাব্বী তাঁর নামের সাথে বিপিএএ ব্যবহার করছেন। একই উপাধি যুক্ত রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আজিজুর রহমান, ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পারভেজ হাসান এবং বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের যুগ্ম সচিব মঞ্জুরুল হাফিজ।
এ প্রসঙ্গে যুগ্ম সচিব গোলাম রাব্বী বলেন:
"সরকার নীতিমালা সংশোধন করেনি। নীতিমালা যতক্ষণ বাতিল না হচ্ছে, ততক্ষণ উপাধি থাকবে।"
অন্যদিকে বিষয়টিতে নজরদারির আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত সচিব মনিরুল ইসলাম জানান:
"নামের সঙ্গে কেউ কেউ বিপিএএ ব্যবহার করছেন– এটা আমি লক্ষ্য করিনি। শিগগিরই আমরা এই বিষয়টা দেখব।"