
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, “জুলাই সনদ রক্তের অক্ষরে শপথের স্বাক্ষর। যে তরুণ পথে নেমেছে, যে যুবক কাজ ফেলে রাজপথে নেমেছে, যে বাবা ছেলেকে মিছিলে পাঠিয়েছে, যে শ্রমিক প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে, তাদের সবার ঋণই ‘জুলাই সনদ’। এর প্রতিটি অক্ষর কালো কালিতে লেখা হলেও পটভূমি রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে।”
মঙ্গলবার (০৩ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আয়োজিত এই সভায় গণভোটের প্রচার ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ড. আলী রীয়াজ বলেন, “আর কোনো স্বৈরাচার যেন জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে, জনগণের অধিকার পদদলিত না হয়, কাউকে গুম করা না যায়, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া না হয় — এজন্য ‘জুলাই সনদের প্রতি সম্মতি জানিয়ে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে জয়যুক্ত করতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যারা ষোলো বছর ধরে ফ্যাসিবাদের নিগড়ে জীবন দিয়ে স্বাধীন স্বদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়েছেন, তারা আমাদের জন্য দায়িত্বের পথ সুস্পষ্ট করেছেন। এই দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র ফিরতে না দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য পথনকশা নির্ধারণ করা। ড. আলী রীয়াজ বলেন, “দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ ২৭ থেকে ৩৭ বছরের নিচে। আগামী অন্তত ৪০ বছরে আমাদের মাতৃভূমি কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব।”
তিনি অগুনতি শহীদের আত্মাহুতির মূল্য নষ্ট না হওয়ার বিশ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “এ দেশের জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে কথা বলবে এবং বাংলাদেশ সমৃদ্ধি ও সাফল্যের পথে এগিয়ে যাবে।”
ড. আলী রীয়াজ অতীতে সংবিধান সংশোধনের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ২০০৯ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু কমিটিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের সদস্য ছিলেন না। এরপর প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়ন হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তিনি বলেন, “সংবিধান সংশোধনী আর যেন ছেলেখেলায় পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করার সময় এসেছে।”
তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রহসনের কথাও উল্লেখ করে বলেন, “প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, “সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি সুপারিশ গণভোটে আসছে চারটি ক্যাটাগরিতে। কার্যত প্রশ্নটি একটাই — আপনি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে নাকি বিপক্ষে?”
তিনি আরও বলেন, “গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে, যা কতটা নির্মম ও নৃশংস হতে পারে তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার-ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। জুলাই অভ্যুত্থান সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ দিয়েছে। আমাদের কাজ এই সুযোগকে কাজে লাগানো।”
মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ সভাপতিত্ব করেন। সভায় ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।