
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত জাদুঘরের চূড়ান্ত ধাপের কাজের অগ্রগতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে তিনি গণভবনে অবস্থিত জাদুঘরে পৌঁছে অভ্যুত্থানের পটভূমি ও শেখ হাসিনার টানা ১৬ বছরের শাসনামলের চিত্রসমূহ ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব।
এ সময় উপস্থিত উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম।
এ ছাড়া গুমের শিকার পরিবারগুলোর সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা তুলি, গুম থেকে ফিরে আসা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আব্দুল্লাহও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে জাদুঘরের কিউরেটর তানজীম ওয়াহাব, মেরিনা তাবাসসুম খান, গবেষকসহ সংশ্লিষ্টরা অতিথিদের জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখান।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে অভ্যুত্থানকালীন আলোকচিত্র, নানা স্মারক, শহীদদের পোশাক ও চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সে সময়কার পত্রিকার কাটিং এবং অডিও-ভিডিও উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্যও প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
পরিদর্শনের অংশ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা একটি ১৫ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র দেখেন, যেখানে ফ্যাসিস্ট শাসনামলে গুম, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, বিরোধীদের ওপর হামলা এবং চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নির্মিত।
জাদুঘর ঘুরে দেখে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এই জাদুঘর জুলাই শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই করা সম্ভব হয়েছে, এটা গোটা পৃথিবীর এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই না ভবিষ্যতে কোথাও আর এমন জাদুঘর তৈরির প্রয়োজন হোক। যদি আমাদের জাতি কখনো কোনো কারণে দিশেহারা হয়, এই জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত হবে এখানে এসে একটি দিন কাটানো, শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে এই জাদুঘরে আসবেন। এই জাদুঘরে একটা দিন কাটালে মানুষ জানতে পারবে কী নৃশংসতার মধ্য দিয়ে এ জাতিকে যেতে হয়েছে।’ তিনি আয়নাঘর প্রসঙ্গে বলেন, ‘এখানে যে আয়নাঘরগুলো তৈরি হয়েছে, সেখানে কিছু সময়, কয়েক ঘণ্টা অথবা একটা দিন কেউ যদি থাকতে চায়, সে যেন থাকতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আয়নাঘরে বসে পরিদর্শনকারীরা উপলব্ধি করতে পারে কী নৃশংসতার মধ্যে বন্দিরা ছিল! … এই একটা মতে আমরা সবাই এক থাকব যে এই ধরনের নৃশংস দিনগুলোতে এ জাতি আর ফিরে যাবে না।’
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘নৃশংস একটা কাণ্ড হচ্ছিল। তরুণরা, ছাত্ররা এটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, প্রতিহত করেছে… সাধারণ মানুষও যে এমন নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে পারে- এটাই আমাদের শিক্ষা।’
জাদুঘর নির্মাণে যুক্ত সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা।
এ সময় সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘অল্প সময়ে এই জাদুঘরের কাজ এই পর্যায়ে এসেছে, এটা একটা রেকর্ড।’ তিনি জানান, অনেক তরুণ-তরুণী আট মাস ধরে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছেন এবং তাদের অবদানের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আরও বেশ কিছু সেকশনের কাজ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হবে। নির্বাচনের আগেই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। জুলাই জাদুঘর ইতিহাসের চিহ্ন বহন করে দাঁড়িয়ে থাকবে।’ তাঁর মতে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আলোচনা, শিক্ষা, গবেষণা এবং শিল্প-সাহিত্য চর্চায়ও এই জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।