
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সরকারি বাসা ছাড়ার বিষয়টি ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছেন দুই সাবেক ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম।
পদত্যাগের পর কবে সরকারি বাসা ছাড়বেন, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন তাঁরা। মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগেই তিনি মন্ত্রিপাড়ার সরকারি বাসা ছেড়ে দেবেন। অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ দাবি করেছেন, তিনি প্রায় এক মাস আগেই সরকারি বাসা ত্যাগ করেছেন।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই জানা গেছে। বুধবার রাতে হেয়ার রোডের সরকারি বাসভবন ‘নিলয়-৬’ এ গিয়ে দায়িত্বে থাকা এক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসিফ মাহমুদ এখনো ওই বাসা ব্যবহার করছেন। সেখানে কর্মরত আরেকজন কর্মচারী বলেন, “স্যার তো আছেন, বাসা ছাড়েননি।”
যদিও ওই কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২৭ বছর বয়সী সাবেক এই উপদেষ্টা বেশিরভাগ সময় পরিবাগের একটি বাসায় অবস্থান করেন। একই এলাকার উপদেষ্টাদের বাসায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য জানান, “এখানে তিনি নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন, লোকজন নিয়ে আসেন, এখানে থাকেন।”
গত ১০ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন উপদেষ্টা পরিষদের দুই ছাত্র প্রতিনিধি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম। সে সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের পদত্যাগ কার্যকর হবে। পরদিন ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হয়।
এই হিসাবে পদত্যাগের পর প্রায় ৫০ দিন ধরে তাঁরা সরকারি বাসায় অবস্থান করছেন। এর মধ্যে আসিফ মাহমুদ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বুধবার রাতে আসিফ মাহমুদ বলেন, তিনি বর্তমানে সরকারি বাসায় থাকেন না এবং প্রায় এক মাস আগে সেটি ছেড়ে দিয়ে পরিবাগের বাসায় বসবাস করছেন।
অন্যদিকে মাহফুজ আলম হেয়ার রোডের ‘উত্তরায়ণ-৩’ নম্বর ডুপ্লেক্স বাংলোতে অবস্থান করছেন। কবে নাগাদ বাসাটি ছাড়বেন জানতে চাইলে তিনি বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, তিনি নির্বাচনের আগেই বাসা বুঝিয়ে দেবেন। ৩০ বছর বয়সী এই সাবেক উপদেষ্টা বলেন, “নীতিমালায় বাসা ছাড়ার বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। তবে নির্বাচনের আগে আমি বাসা ছেড়ে দেব।”
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, সাবেক এই দুই উপদেষ্টা কবে নাগাদ বাসা ছাড়বেন বা কতদিন থাকবেন, সে বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তিনি বলেন, “আবাসন বরাদ্দ নীতিমালায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর দুই মাস পর্যন্ত বাসভবনে থাকতে পারবেন। তবে সন্তানরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত হলে আরও চার মাস পর্যন্ত থাকতে পারবেন। কোনো সরকারি কর্মচারী বদলি হলেও এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই মাস, সন্তান পড়াশোনা করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকার সুযোগ পান। তবে মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের বিষয়ে কোনো সময় উল্লেখ নেই।”
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, সাবেক দুই উপদেষ্টা এখনো বাসা ছাড়েননি বিষয়টি তিনি সচিবকে অবহিত করেছেন এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পটভূমিতে রয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে সেই দিন থেকেই আসিফ মাহমুদ সরকারে যোগ দেন। তিনি স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট মাহফুজ আলমকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ১০ নভেম্বর তিনি উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করলে মাহফুজ আলমকে তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পদত্যাগের পরও সরকারি বাসা না ছাড়ায় নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, “জিয়াউর রহমানের ক্যাবিনেট থেকে কাজী জাফর আহমেদ পদত্যাগ করেছিলেন। বঙ্গভবনে উনি নিজেই গিয়েছিলেন পদত্যাগপত্র নিয়ে এবং পদত্যাগ দিয়ে উনি আর সরকারি গাড়িতে উঠেন নাই। একটা প্রাইভেট গাড়িতে বাসায় ফিরেছেন এবং উনি পদত্যাগপত্র দেওয়ার দুইদিন আগে সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছিলেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের রাজনীতিবিদরা এমনটা করলেই ভালো, আমরা তাদের কাছ থেকে এমনটা প্রত্যাশা করি এবং সেটাই হয়তো উচিত। আমরা যে আসলে নীতি-নৈতিকতার দিক থেকে পিছনের দিকে হাঁটতেছি, এটা উদাহরণ হল তাদের (আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম) বাসা না ছাড়া। ধরেন, এখন ৭৮ থেকে ২০২৬ সালে এসে অনেক এগিয়ে যাওয়া জায়গায় আমরা নীতি-নৈতিকতার দিক থেকে পিছিয়ে।”