
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একের পর এক উড়োজাহাজে বোমা হামলার ভুয়া হুমকির ঘটনায় ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে বিমান চলাচল। একই সাথে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হাইব্রিড যুদ্ধের ভয়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক দিনেই অন্তত ১৬টি দেশে ২৫টি ফ্লাইটকে লক্ষ্য করে এমন হুমকি দেওয়া হয়। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় কয়েকটি উড়োজাহাজকে জরুরি অবতরণ করতে হয়েছে, আবার কিছু ফ্লাইটের নির্ধারিত গন্তব্য পরিবর্তন করা হয়েছে। এর আগে সপ্তাহের শুরুতেও একই ধরনের হুমকিতে একাধিক উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো এবং সেগুলোর যাত্রাপথ পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে চলতি সপ্তাহে অন্তত ৩৩টি ফ্লাইট এ ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার ইতালি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ফ্রান্স, গ্রিস, সার্বিয়া ও চেকিয়ায় এসব হুমকির খবর পাওয়া যায়। এতে রায়ানএয়ার, অ্যার লিঙ্গাস, উইজ এয়ার, ফিনএয়ার, ইজিজেট, এজিয়ান এয়ারলাইনস, আইবেরিয়া, স্কাই এক্সপ্রেস, এয়ার সার্বিয়া এবং এলওটি পোলিশ এয়ারলাইনসের বিভিন্ন ফ্লাইট প্রভাবিত হয়।
তবে এতগুলো হুমকি সত্ত্বেও কোনো উড়োজাহাজের যাত্রী বা ক্রুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। সব ফ্লাইটই শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করেছে। সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজগুলোতে নিরাপত্তা তল্লাশি চালিয়েও কোনো বিস্ফোরক কিংবা সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের হিথ্রো ও বার্মিংহাম বিমানবন্দরেও বৃহস্পতিবার রাতে বোমা হামলার হুমকি আসে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তে নামে মেট্রোপলিটন পুলিশের বিমানবন্দর নিরাপত্তা বিভাগের বিশেষজ্ঞরা। তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে হুমকি দুটিকে ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত করেন তাঁরা।
এর আগে মঙ্গলবার ইউরোপের সাতটি উড়োজাহাজে একই ধরনের বোমা হামলার হুমকি পাওয়া যায়। সেসব ক্ষেত্রে কয়েকটি উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো হয় এবং কয়েকটির নির্ধারিত যাত্রাপথ পরিবর্তন করতে হয়। এ ছাড়া সোমবার যুক্তরাজ্য থেকে বুলগেরিয়াগামী একটি ফ্লাইটও বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর গন্তব্য পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
তবে ধারাবাহিক এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা। কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন কিংবা রাশিয়া বা ইরানের মতো রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার পক্ষে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার উৎস ও সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ইতালির রোম ও বুলগেরিয়ার সোফিয়া বিমানবন্দরে পাঠানো কয়েকটি হুমকিমূলক ই-মেইলে ‘মেল স্টেট’ নামের একটি সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সংগঠনটি রাশিয়াভিত্তিক একটি উগ্র ডানপন্থী, জাতীয়তাবাদী ও নারীবিদ্বেষী আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালে ভ্লাদিস্লাভ পোজনিয়াকভ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সাম্প্রতিক বোমা হামলার হুমকির সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছেন তিনি।
হুমকিমূলক ই-মেইলগুলোতে প্রেরকেরা নিজেদের ওই সংগঠনের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়। পাশাপাশি উড়োজাহাজ বা বিমানবন্দরে বিস্ফোরণ ঘটানোর কথা জানিয়ে বলা হয়, এক ঘণ্টার মধ্যেই বোমার বিস্ফোরণ ঘটবে। যদিও বার্তাগুলোর সত্যতা এবং সংগঠনটির সঙ্গে হুমকিদাতাদের প্রকৃত কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আয়ারল্যান্ডের কর্ক বিমানবন্দরেও বৃহস্পতিবার সকালে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ফোনে একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি বোমা হামলার হুমকি দেন। এর প্রভাবে লন্ডনের স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে কর্কে আসা রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটের যাত্রা বিলম্বিত হয়।
অন্যদিকে ইতালির পেসকারা থেকে বেলজিয়ামের চারলেরোয়া বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করা রায়ানএয়ারের আরেকটি উড়োজাহাজে সন্দেহজনক বার্তা পাওয়া যায়। উড়োজাহাজটির শৌচাগারের দেয়ালে ‘বোমা’ শব্দটি লেখা দেখতে পান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিষয়টি জানার পর উড়োজাহাজটিতে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয়।
ইউরোপের আকাশসীমায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ চলাচল করে। ইউরোপীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোকন্ট্রোলের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার মহাদেশজুড়ে মোট ২৭ হাজার ৪০০টি ফ্লাইট পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। সেই তুলনায় হুমকির শিকার ফ্লাইটের সংখ্যা কম হলেও একসঙ্গে এতগুলো উড়োজাহাজে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হওয়ায় যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব পড়েছে। কোথাও ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়েছে, কোথাও আবার যাত্রাপথ ও অবতরণের পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে।
এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক দেশে একই ধরনের হুমকি ছড়িয়ে পড়ায় এর পেছনে কোনো সমন্বিত তৎপরতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপে সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বা প্রচলিত সামরিক সংঘাতের বাইরে বিভিন্ন উপায়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের তৎপরতা ‘আন্ডার-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার’ বা প্রচলিত যুদ্ধের সীমার নিচে থাকা সংঘাতের অংশ হতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বৈশিষ্ট্য হলো, এর মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হলেও সরাসরি কারা এর পেছনে রয়েছে, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এসব ঘটনার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, বিভিন্ন ঘটনার জন্য রুশ প্রশাসনকে দায়ী করার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং অযৌক্তিক।
বিমান চলাচল খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো উড়োজাহাজে বোমা হামলার ভুয়া হুমকি পাওয়া নতুন ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত শত্রুতা, আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে এ ধরনের হুমকি দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এত বিপুলসংখ্যক ফ্লাইটকে লক্ষ্য করে একই ধরনের হুমকি আসা স্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতি নয়। এটি পরিকল্পিত বা সমন্বিত কোনো কর্মকাণ্ডের অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাবেক বিমানচালক মার্টিন ড্রেক বলেন, কোনো উড়োজাহাজ আকাশে থাকা অবস্থায় বোমা হামলার হুমকি পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। সে ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা কিংবা কাছাকাছি কোনো বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের ব্যবস্থা করতে হয়। কারণ, হুমকিটি সত্যি না মিথ্যা, তা নিশ্চিত হওয়ার আগেই সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। সামান্য সন্দেহের কারণ থাকলেও এ ধরনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিমান চলাচলবিষয়ক বিশ্লেষক রাইস জোনসের ধারণা, সাম্প্রতিক হুমকির ঘটনাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে এসব কর্মকাণ্ডে ইউরোপের কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল কিংবা বিমান চলাচল ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে—এমন কোনো সুস্পষ্ট চিত্র এখনো সামনে আসেনি।
তিনি আরও মনে করেন, এ ধরনের হুমকি ঘন ঘন ঘটতে থাকলে বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একধরনের সতর্কতাজনিত অভ্যস্ততা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, বারবার একই ধরনের ভুয়া হুমকি পাওয়ার কারণে একসময় নিরাপত্তাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে সত্যিকারের কোনো হামলার হুমকি এলে সেটিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।