
ব্যাপক আর্থিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল ব্যাংক উয়েনোর পতনকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ব্যাংকটির ধসের প্রভাবে প্যারাগুয়ের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক নিজেদের ব্যাংক হিসাবে জমা অর্থ ব্যবহারের সুযোগ হারিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের মধ্যে উয়েনো ব্যাংকের গ্রাহক ছিলেন প্রায় ৩০ লাখ। অর্থাৎ ব্যাংকটির বিপর্যয়ে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ধারণ করা এক ভিডিও বার্তায় পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেন পেনা। তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি বজায় রাখা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার স্বার্থেই তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের ঘোষণা দিলেই তা কার্যকর হবে না। এজন্য দেশটির সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। আইনপ্রণেতারা জানিয়েছেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে সিনেট শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের জন্য কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে পারেন।
উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা চলছিল। সংকটের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পদত্যাগ করেন। একই দিনে উয়েনো ব্যাংকের আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা আত্মসমর্পণ করেন। তদন্তের অংশ হিসেবে আদালত তাদের সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি কয়েকজন কর্মকর্তাকে গৃহবন্দি রাখার আদেশও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন কার্যক্রম শুরু করতে কংগ্রেসে বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে বিরোধী দলগুলো। একই সময়ে পেনার পদত্যাগের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন নিজ দলের রক্ষণশীল নেতাদের একটি অংশও তার পাশ থেকে সরে যায়। এতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেনার রাজনৈতিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
উয়েনো ব্যাংকের সঙ্গে পেনার ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা
ব্যাংকটির পতনের পর প্রেসিডেন্ট পেনার অতীত ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৩ সালে নির্বাচিত পেশায় অর্থনীতিবিদ পেনা একসময় উয়েনো ব্যাংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রুপো ভাসকেজের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা বজায় ছিল।
এই সম্পর্কের সূত্র ধরে আইনপ্রণেতাদের একাংশ অভিযোগ করেছেন, উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক সংকটের পেছনে স্বার্থের সংঘাত, পেনশন তহবিলের অর্থের অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার বিষয় রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন পেনা। তার বক্তব্য, মূলত কারিগরি ও নিয়ন্ত্রকসংক্রান্ত একটি সমস্যাকে রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। ব্যাংকটির কার্যক্রমে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে তা আদালতের মাধ্যমে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর পর্যালোচনা চালিয়ে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সচ্ছলতার শর্ত পূরণে ব্যর্থতার প্রমাণ পায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এই পদক্ষেপের পর ব্যাংকটির সংকট আরও গভীর হয়। উল্লেখ্য, প্যারাগুয়ের সরকারি তহবিলের প্রায় ৮৫ কোটি ডলারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও ছিল উয়েনো ব্যাংকের হাতে।
পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় পেনা ব্যাংকটির গ্রাহকদের আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমানত সুরক্ষা তহবিল যেন যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং জনগণের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, সেটিই তার প্রধান প্রত্যাশা। ব্যাংকটির সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।