
ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্কুলভবনে রুশ বাহিনীর বোমা হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫০ জন। নিখোঁজ ব্যক্তিরা ভবনটির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের কোমাইশুভাখা গ্রামে এ হামলা হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মঙ্গলবার হামলার তথ্য জানিয়ে একে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভবনটি স্কুল হলেও সেখানে নিয়মিত পাঠদান চলছিল না। স্থানীয় গভর্নর মাইখাইলো সেমিকিন জানান, ভবনটি বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয়কেন্দ্র এবং মানবিক সহায়তা বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
সেমিকিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিরা ভবনটির ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থায়নে নির্মিত ওই বেসমেন্ট হামলা মোকাবিলার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। তবে রুশ বাহিনীর বোমার আঘাতে কংক্রিটের কাঠামো ধসে পড়ে এবং সেখানে আগুন ধরে যায়।
যুদ্ধের মধ্যে পাঠদান চালু রাখার উদ্দেশ্যে গত বছর আশ্রয়কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি গ্রামটির কাছাকাছি চলে আসায় অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে যান। ফলে স্কুল হিসেবে ভবনটির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। পরে স্থানীয় প্রশাসন এটিকে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও মানবিক সহায়তা বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।
জাতিসংঘের ইউক্রেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানায়, হামলার সময় ওই এলাকায় মানবিক সহায়তা নিতে বেসামরিক নাগরিকেরা জড়ো হয়েছিলেন।
মিশনটির প্রধান ড্যানিয়েল বেল বলেন, মানবিক সহায়তা বিতরণের সময় ও স্থান সম্পর্কে আগেই ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছিল। রুশ বাহিনী হয়তো জানত সেখানে সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে, অথবা হামলার পরিকল্পনা করা এলাকায় কী ঘটছে, তা জানার ন্যূনতম চেষ্টাও করেনি। দুই ক্ষেত্রেই হামলাটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে।
জেলেনস্কি জানান, স্কুলভবনে হামলার পর রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন এবং ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিস শমিহাল জানান, খমেলনিৎস্কি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সাবস্টেশন লক্ষ্য করে তিনটি ড্রোন নিক্ষেপ করে রুশ বাহিনী। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এ ধরনের হামলা পুরো ইউরোপের পারমাণবিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস নির্বাচন চলার দিনেই এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাশিয়া হয়তো মনে করছে, তাদের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের নজরে আসবে না। তবে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সামনে আনা এবং বন্ধ করা জরুরি।
ইউক্রেনের আকাশসীমা সুরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জেলেনস্কি বলেন, তা না হলে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করবে না। আন্তরিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলাগুলো এমন সময়ে ঘটল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে আলোচনার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ নরওয়েতে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গে যান।
এদিকে ইউক্রেনের অধিকৃত ওলেশকি শহরে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে সহায়তা করেছেন বলে জানানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের ভূমিকা সম্পর্কে। এর ফলে সপ্তাহান্তে শত শত বেসামরিক নাগরিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর ওভাল হাউস মঙ্গলবার জানিয়েছে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের আগামী বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মেলানিয়া ট্রাম্প। এ উদ্যোগকে ‘মার্কিন ইতিহাসের এক অসাধারণ মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছে দপ্তরটি।