
একদিকে বিদ্যুৎ বিপর্যয়, অন্যদিকে বিমান চলাচল ও যোগাযোগব্যবস্থায় অচলাবস্থা—পরপর দুটি শক্তিশালী ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তর ইউরোপের কয়েকটি দেশ। রোববার (২৫ অক্টোবর) পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিতে দেড় লাখের বেশি বাড়িঘর বিদ্যুৎহীন ছিল। ঝড়ের প্রভাবে শত শত ফ্লাইট বাতিল বা অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বোয়েলো ও অস্টেন নামের দুটি ঝড়ের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি। দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে ৮২ হাজারের বেশি, ফ্রান্সে প্রায় ৬০ হাজার এবং জার্মানিতে অন্তত ১০ হাজার বাড়িঘর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
স্কটল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের আর্গাইল অ্যান্ড বিউট এলাকায় ঝোড়ো বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছ ও ছিঁড়ে যাওয়া বিদ্যুতের তারের কারণে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে সড়ক এবং রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের এনার্জি নেটওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ঝড়ের বিভিন্ন পর্যায়ে দেশটিতে চার লাখের বেশি বাড়িঘর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছিল। শুক্রবার অস্টেন ঝড়ের তাণ্ডবে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের ব্রাইটনের একটি পুরোনো জেটির অংশও উড়ে যায়। ২০০৩ সালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে জেটিটি অব্যবহৃত ছিল।
ইংলিশ চ্যানেলের অপর পারে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলেও ঝড়ের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনেদিস জানিয়েছে, শনিবার অস্টেন ঝড়ের তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬০০ বাড়িঘর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। রোববার দুপুরেও প্রায় ৫৯ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। এর বেশির ভাগই নরম্যান্ডি ও ব্রিটানি অঞ্চলে।
বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধারে এনেদিসের প্রায় ২ হাজার ৬০০ কর্মী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কাজ করছেন।
জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ফ্রাইবুর্গ ইম ব্রাইসগাউ শহর ও আশপাশের এলাকায় রোববার ঝড়ের কারণে প্রায় ১০ হাজার বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে শহরটির প্রধান হাসপাতাল জরুরি রোগীদের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হয়। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পাশাপাশি মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক সেবাও ব্যাহত হয়।
এদিকে, শনিবার জার্মানির নাসটাটেন শহরে শরৎকালীন মেলা চলার সময় ঝোড়ো বাতাসে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি মাচা উড়ে যায়। এতে দুজন গুরুতর আহত হন বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ।
জার্মানির আবহাওয়া সংস্থা ডিডব্লিউডি রোববার দেশটির উত্তর উপকূলে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামেও ঝড়ের প্রভাব পড়েছে। শনিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গাছ পড়ে চারজন আহত হন।
ঝড়ের কারণে উত্তর ইউরোপজুড়ে বিমান চলাচলেও ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। অনেক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, আবার কিছু উড়োজাহাজকে বিকল্প বিমানবন্দরে পাঠানো হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের শিফল বিমানবন্দরে রোববার কয়েক ডজন ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে এএফপি প্রায় ৯০টি ফ্লাইট বাতিলের হিসাব পেয়েছে। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর বেশির ভাগের গন্তব্য ছিল প্যারিস, রোম ও ডাবলিনসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহর। এ ছাড়া বিমানবন্দরটিতে অবতরণের কথা থাকা আরও কয়েক ডজন ফ্লাইটও বাতিল করা হয়।
ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল ও স্কটল্যান্ডেও ঝড়ের কারণে উড়োজাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
ইউরোপে চলতি বছরের শরৎকালের প্রথম বড় ঝড়গুলোর আঘাতে সৃষ্ট এ পরিস্থিতির মধ্যে বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ভবিষ্যতে আরও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।