
বিক্ষোভের আড়ালে সহিংসতা ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাজধানী রোম, মিলানসহ ইতালির একাধিক শহরে পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি পাঁচ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছিল সরকার। শনিবারের বিক্ষোভে বড় ধরনের সহিংসতা বা লুটপাটের ঘটনা না ঘটায় কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপকে সফল বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ইতালির বিভিন্ন শহরে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তবে এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য কোনো সহিংসতা, লুটপাট কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
ইতালির সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, মিলান, রোম ও তুরিনসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। আগের সপ্তাহে একই ধরনের কর্মসূচিতে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায় এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়।
নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনেকাংশেই কার্যকর হয়েছে। মিলানে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও রোম ও তুরিনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে সেগুলো বড় ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি করেনি।
মিলানে অতিরিক্ত সেনা
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার মিলানের বিভিন্ন সড়কে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর মিছিল চলার সময় নিরাপত্তার জন্য সেনাসদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়। শহরের অভিজাত বিপণিবিতান ও বিলাসপণ্যের দোকানগুলোর সামনের কাচের জানালা কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে বিকেলের দিকে অধিকাংশ দোকান আবার খুলে দেওয়া হয়।
বিক্ষোভের নামে লুটপাট ও সহিংসতা বন্ধে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে মিলানে আরও ৫০০ সেনা পাঠানো এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের শাস্তি কঠোর করা।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের সহিংস বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মিলানে বেশ কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করেছে পুলিশ।
ইউরোপজুড়ে নানা দাবিতে বিক্ষোভ
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে থাকলেও শনিবার ইউরোপের আরও অনেক শহরে বড় সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল ইতালির মিলান ও রোম, স্পেনের মাদ্রিদ, পর্তুগালের লিসবন এবং আলবেনিয়ার তিরানা।
বিক্ষোভকারীরা শিক্ষা, দুর্নীতি, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, পেনশন ও আবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মিলানে প্রধানত তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে বড় জমায়েত তৈরি হয়। এ সময় তারা প্রধানমন্ত্রী মেলোনির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীদের বহন করা একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘রাষ্ট্রের মিথ্যাচার মানি না’।
স্থানীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দৃশ্যে একদল বিক্ষোভকারীকে ইতালির জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যালয়ের সামনে গোবর ফেলতে দেখা যায়। একই সঙ্গে সরকারের সাফল্যের কথা উল্লেখ করা একটি বড় বৈদ্যুতিক বিজ্ঞাপনফলকে আগুন দেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। এটি ছিল প্রতীকী প্রতিবাদের অংশ।
পাঁচ হাজার নিরাপত্তাকর্মীর নজরদারি
ইতালির প্রধান আর্থিক কেন্দ্র ও অন্যতম সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক শহর মিলানে আগে থেকেই সেনাসদস্য মোতায়েন ছিল। শনিবার সেখানে নতুন করে আরও ৫০০ সেনা যোগ দেন। তাঁরা শহরে দায়িত্ব পালনরত প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে সহায়তা করেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, রেলস্টেশনগুলোতে তল্লাশি, দ্রুত সাড়া দেওয়ার বিশেষ দল মোতায়েন এবং সহিংসতায় উসকানি দেওয়া হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করতে অনলাইনে পর্যবেক্ষণ।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মিলানের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেওয়া পিয়েরফ্রান্সেস্কো মাজোরিনোও শনিবারের মিছিলে অংশ নেন। ২০২৭ সালের শুরুর দিকে মধ্য-বামপন্থী জোটের প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। অন্যদিকে, ২০১৬ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা মিলানের বর্তমান মধ্য-বামপন্থী মেয়র জিউসেপ্পে সালা আগামী নির্বাচনে আর অংশ নেবেন না।
বিলাসবহুল দোকান ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
মিলানের ফ্যাশনপল্লিতে অবস্থিত ওমেগা, টিফানি ও গুচিসহ বিভিন্ন বিলাসপণ্যের দোকানের কাচের জানালা কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। অ্যাপলের বিক্রয়কেন্দ্রটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শনিবার সন্ধ্যায় অন্যান্য দোকান আবার খুললেও সেটি বন্ধ ছিল।
এর আগে গত সপ্তাহের শেষ দিকে দাঙ্গায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা শহরের কেন্দ্রীয় দুওমো চত্বরের আশপাশের সড়কগুলোতে বিভিন্ন দোকানে ঢুকে জুতা, খেলাধুলার পোশাক এবং অন্যান্য ক্রীড়াসামগ্রী লুট করে।
বিক্ষোভকারীরা শহরের অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কায় নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু কেন্দ্রীয় অংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বরং শহরের বিস্তৃত এলাকায় নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
শনিবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীরা শহরের কেন্দ্র থেকে তিন কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত মিলান পলিটেকনিকের সামনে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল শেষ করেন।
গত সপ্তাহের ঘটনায় ৪৫ জন গ্রেপ্তার
মিলান পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহের সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় প্রায় দুই হাজার তরুণ বিক্ষোভকারী জড়িত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়া অভিবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকেও ছিলেন।
দুই দিনের অভিযানে পুলিশ মোট ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
এদিকে, ‘ইন্টার মিলান’ ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু উগ্র ডানপন্থী ব্যক্তি অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত হন। তাঁদের অনেকেই গুন্ডা হিসেবে পরিচিত। সেখানে তাঁরা অভিবাসী ও মুসলিমবিরোধী স্লোগান দেন। তবে পুলিশ দ্রুত তাঁদের অন্য বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়।
সেনাদের ক্ষমতা সীমিত
প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো জানিয়েছেন, শনিবার মোতায়েন করা সেনাসদস্যদের সম্প্রতি প্লাস্টিকের হাতবন্ধনী ব্যবহার করে কাউকে আটক রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষমতা শুধু রেলস্টেশনগুলোর আশপাশের এলাকায় প্রযোজ্য, পুরো শহরে নয়।
তিনি আরও জানান, সেনাসদস্যদের সঙ্গে মরিচের গুঁড়ার স্প্রে কিংবা বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র রাখার অনুমতি নেই।
রাজধানী রোমেও নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে বিলাসপণ্য কেনাকাটার জন্য পরিচিত সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি সার্কাস ম্যাক্সিমাস ও পিয়াজ্জা দেল পোপোলো এলাকার আশপাশে নজরদারি বাড়ানো হয়।