
ইরানে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের ব্যবহার বন্ধ করতে অভিযান আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স পরিচালিত স্টারলিংক ইরানের সরকারি নজরদারি ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এড়িয়ে অনলাইনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। তবে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে দেশটিতে এই সেবা নিষিদ্ধ। স্টারলিংক ব্যবহার কিংবা এর যন্ত্রাংশ বিতরণের জন্যও রয়েছে কারাদণ্ডের বিধান।
স্টারলিংককে ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ বলছে তেহরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর দেশটিতে ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়েছে। ২০২৬ সালে প্রায় ৯ কোটি ইরানি দুই দফায় দীর্ঘ সময়ের জন্য বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছেন। জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় টানা তিন সপ্তাহ এবং চলমান যুদ্ধের শুরুর দিকে ৮৮ দিন ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সাইবারস্পেস কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ আমিন আগামিরি স্টারলিংককে শত্রুপক্ষের ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই প্রযুক্তি শত্রুপক্ষের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্টারলিংকের স্যাটেলাইট টার্মিনাল অকার্যকর করার একাধিক পদ্ধতি তাঁদের হাতে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ঠিক কী প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংযোগ বন্ধ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি আগামিরি।
ইরানে স্টারলিংক ব্যবহার করা বা নিজের কাছে রাখার দায়ে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। যন্ত্র আমদানি ও বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘন বা গুপ্তচরবৃত্তির বিষয় যুক্ত হলে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিও রয়েছে।
তেহরানভিত্তিক এক ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, স্টারলিংকের সংযোগে বাধা দিতে বিভিন্ন ধরনের সংকেত-বিঘ্নকারী যন্ত্র ব্যবহার করছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ভুয়া বৈশ্বিক অবস্থান-সংকেত পাঠিয়ে নতুন যন্ত্র চালুর প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
স্থানীয় অ্যাপ ও সেবার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সময় স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট প্রোটোকল শনাক্ত করার চেষ্টাও করা হয় বলে ওই বিশেষজ্ঞের দাবি। এ ছাড়া টহল, চালকবিহীন উড়োজাহাজের সাহায্যে অনুসন্ধান এবং স্টারলিংক টার্মিনাল বিক্রির স্থানে অভিযান চালিয়ে যন্ত্র জব্দের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।
গত জুনে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট দাবি করেন, ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় ইসরাইল ইরানে কয়েক হাজার স্টারলিংক যন্ত্র পাচার করেছিল। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করতেই এসব যন্ত্র পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আপত্তি তেহরানের
স্টারলিংকের সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে ২০২৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের রেডিও রেগুলেশনস বোর্ডে বিষয়টি উত্থাপন করে আসছে ইরান। গত ৪ অক্টোবর তেহরানে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অননুমোদিত স্টারলিংক কার্যক্রম বন্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রতিবাদ জানানো হয়।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরানের উপপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোহাম্মদ হাফেজ হাকামি সতর্ক করে বলেন, স্টারলিংকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দেশটির সাইবারস্পেস নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, ২০১৭-১৮ সালের বিক্ষোভের পর ইরানে টেলিগ্রাম বন্ধ করা হয়। ২০১৯ সালের দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় প্রথমবারের মতো এক সপ্তাহের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। পরে ২০২২-২৩ সালের বিক্ষোভের পর হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করা হয়। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
হাকামির ভাষ্য, স্টারলিংকের ব্যবহার এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সংকটের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার মতো পদক্ষেপও নিতে হতে পারে। কারণ, এই সেবা ইরানের নিজস্ব ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।
২০২২ সাল থেকে ইরানে বিক্ষোভের ভিডিও দেশের বাইরে পাঠানোর ক্ষেত্রে স্টারলিংক ভূমিকা রেখে আসছে। দেশটিতে কয়েক দশ হাজার টার্মিনাল পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি।
তবে উচ্চমূল্য, যন্ত্রের সীমিত প্রাপ্যতা এবং সরকারি অভিযানের ঝুঁকির কারণে অধিকাংশ ইরানি এখনো স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ পান না। তাঁদের অনেকে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কসহ (ভিপিএন) বিভিন্ন প্রযুক্তির সাহায্যে আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব ব্যবস্থায় ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
হোয়াটসঅ্যাপ চালুর সম্ভাবনা, ইউটিউব নিয়ে শর্ত
ইরান সরকারের বক্তব্য, সাইবার হামলা থেকে নাগরিক ও জাতীয় সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে কখনো কখনো ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার ও ইন্টারনেটনির্ভর সেবার নিরাপত্তা বিবেচনা করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাইবারস্পেস নীতি ও পরিচালনাসংক্রান্ত একটি নথিতে কয়েকটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, গুগল প্লে ও হোয়াটসঅ্যাপ আবার চালু করা হতে পারে।
তবে ইউটিউব ও টেলিগ্রাম চালু করতে হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব প্ল্যাটফর্ম কবে চালু হতে পারে, সে বিষয়ে নথিতে কোনো সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে যুদ্ধের মধ্যে ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিধিনিষেধ শিথিল হবে, নাকি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।