
বাণিজ্য আলোচনা, রাশিয়ার তেল কেনা, পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ এখন প্রকাশ্যেই উঠে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ইস্যুতে নয়াদিল্লির অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার সময় জয়শঙ্কর বলেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদের যে হুমকির মুখে ভারত রয়েছে, সেটি অংশীদার দেশগুলো যথাযথভাবে না বুঝলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তার প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বাণিজ্য আলোচনা, শুল্ক অনিশ্চয়তা ও অভিবাসন নিয়েও কথা বলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কে বাণিজ্য, ভারতের রুশ জ্বালানি আমদানি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। একই সময়ে দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাণিজ্য নিয়ে মতপার্থক্য
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বড় আলোচনার বিষয় বাণিজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং ভারত থেকে আমদানি ১০৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, আলোচনা অব্যাহত থাকলেও দ্রুত কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
কৃষি খাতও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের কৃষকদের সুরক্ষার বিষয়টি দেশটির বাণিজ্যনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে বলে জয়শঙ্কর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রাশিয়ার তেল ও শুল্ক
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের মতপার্থক্য রয়েছে। রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে ভারত এর আগে সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ক ও বাণিজ্য আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে একই সময়ে ভারত বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরেও রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী ছিল, যদিও দেশটির মোট আমদানিতে রাশিয়ার অংশ আগের তুলনায় কমেছে।
পাকিস্তান ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যু
ভারতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ পাকিস্তান। জয়শঙ্কর নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানে বলেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি হচ্ছে ভারত। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যথেষ্ট বোঝাপড়া না পাওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা নিয়ে নয়াদিল্লির আপত্তি দীর্ঘদিনের। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের যোগাযোগও ভারতের নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় রয়েছে।
এইচ-১বি ভিসা নিয়েও উদ্বেগ
অভিবাসন ও দক্ষ কর্মীদের চলাচলের বিষয়টিও জয়শঙ্করের আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় পেশাজীবী যুক্ত থাকায় ভিসা নীতি ও কর্মসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে ভারতে উদ্বেগ রয়েছে। জয়শঙ্কর বলেন, আগে কর্মীদের আন্তর্জাতিক চলাচলকে অর্থনৈতিক সুবিধার অংশ হিসেবে দেখা হলেও এখন অভিবাসননীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
আলোচনা অব্যাহত
মতপার্থক্য থাকলেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোনে কথা বলেন। দুই নেতা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, উদীয়মান প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন।
এদিকে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। সেখানে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিসহ দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলছে।