
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি এবার প্রকাশ্যেই তুলে ধরছে ভারত। পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ, ওয়াশিংটনের ইসলামাবাদমুখী যোগাযোগ এবং দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনার জটিলতা—এসব বিষয় নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক মন্তব্যে নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হলো প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান ও সংবেদনশীলতাকে অংশীদার দেশগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তার প্রভাব পড়তে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতার দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে বাণিজ্য, শুল্ক, রাশিয়া থেকে ভারতের জ্বালানি আমদানি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নিয়ে একাধিক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে একই সময়ে দুই দেশই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোনে কথা বলেন এবং দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন।
বাণিজ্যেও বড় মতপার্থক্য
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলোর একটি এখন বাণিজ্য। দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, আলোচনায় মোটামুটি একটি বোঝাপড়া তৈরি হলেও চুক্তি চূড়ান্ত করার সময় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও চলমান সেকশন ৩০১ প্রক্রিয়াও আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।
ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো, মাথাপিছু আয় ও উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় পার্থক্য রয়েছে উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি করা সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়। কৃষি খাতও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারত দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের সুরক্ষায় কৃষিপণ্যের বাজারে বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা বজায় রেখেছে।
জয়শঙ্করের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে একটি পর্যায়ে বোঝাপড়া তৈরি হলেও চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন বাধা রয়ে গেছে। তিনি বলেন, একটি চুক্তি শেষ পর্যন্ত হলে তা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ভালো অবস্থানে নিতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন জয়শঙ্কর। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিভিন্ন দেশের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদ ও পাকিস্তান প্রসঙ্গ
ভারতের জন্য পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ। জয়শঙ্কর বলেন, কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে যে ধরনের সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি ভারত হয়েছে, এমন অভিজ্ঞতা খুব কম দেশেরই রয়েছে। ভারতের এই উদ্বেগ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না দেখলে অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কেও ঘনিষ্ঠতা দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের নীতিতে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে নয়াদিল্লিতে আলোচনা বাড়ছে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পাকিস্তান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর মার্কিন ভূমিকা নিয়ে ভারতের অসন্তোষের প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও পড়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা কমাতে নিজেদের ভূমিকার কথা একাধিকবার তুলে ধরেছে। ভারত অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার বিরোধিতা করে আসছে।
অভ্যন্তরীণ চাপও আলোচনায়
ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি এবং এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিশেষায়িত খাতে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় পেশাজীবী কাজ করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে এই কর্মসূচিকে ঘিরে ফি ও অন্যান্য শর্তের পরিবর্তন নিয়ে ভারতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, একসময় বিদেশে কর্মীদের চলাচলকে অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখা হতো। এখন অর্থনীতি ও অভিবাসননীতি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষক অজয় বিসারিয়া মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতির কারণে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। চ্যাথাম হাউসের গবেষক চিয়েটিগ বাজপেয়ি এবং অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হর্ষ পান্তও সাম্প্রতিক ভারত-মার্কিন সম্পর্কের টানাপোড়েনে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও অভিবাসন ইস্যুর প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন।
সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ
মতপার্থক্য থাকলেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর মোদী ও ট্রাম্পের ফোনালাপে দুই নেতা ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হন। একই সময়ে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন এবং একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক বাজপেয়ির মতে, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়লেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা উভয় পক্ষই চালিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের সামনে বাণিজ্য, শুল্ক, সন্ত্রাসবাদ, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ এবং অভিবাসননীতির মতো একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকায় সম্পর্কটি এখন মতপার্থক্য ও সহযোগিতা—দুই ধারার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস