
ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালকে ঘিরে দালালচক্রের তৎপরতা এবং আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নানা প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে বাইরের বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সরকারি কর্মঘণ্টায় হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক বাইরে গিয়ে রোগী দেখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্লিনিকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। এতে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভোগান্তিও বাড়ছে। হাসপাতাল এলাকায় চুরির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মিটফোর্ড এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের ১৫ থেকে ২০০ গজের মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। কোতোয়ালি ও চকবাজার এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।
হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের কাছে রয়েছে ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল, মেডিসান হেলথ কেয়ার ও ডক্টরস ক্লিনিক। ২ নম্বর গেটের সামনে রয়েছে আল আরাফাত, বাঁধন, ম্যাক্স এইড, নিউ ঢাকা মডার্ন ও ঢাকা হাসপাতাল। আর ১ নম্বর গেটের আশপাশে রয়েছে মুনলাইট, ইস্টার্ন ডায়াগনস্টিক ও মেডি লাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি ভবনের নিচতলায় দোকান ও কেমিক্যালের গুদাম এবং ওপরের অংশে ক্লিনিক পরিচালনার দৃশ্যও দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, টেকনিশিয়ান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহ করে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবসা পরিচালনাই এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সরকারি ডিউটির সময়ে ক্লিনিকে রোগী দেখার অভিযোগ
মিটফোর্ড হাসপাতালের আশপাশের কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রচারসামগ্রী ও চিকিৎসক তালিকায় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নাম ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের আস্থা অর্জন করেন দালালরা। পরে তাদের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়।
রোগীদের স্বজনদের কয়েকজন জানান, সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার পরিস্থিতিকে কাজে লাগায় দালালরা। তারা দ্রুত চিকিৎসা ও কম খরচের কথা বলে রোগীদের বাইরে নিয়ে যান।
বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ২০ মিনিটের দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ তানভীরকে হাসপাতালের পাশের ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে রোগী দেখতে দেখা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় তার সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল।
একই সময়ে শিশু বিভাগের চিকিৎসক প্রদীপ মালাকার এবং মেডিসিন বিভাগের আরও তিন চিকিৎসককে ওই ক্লিনিকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালদের কাছ থেকে রোগী সংগ্রহের খবর পেলে কিছু চিকিৎসক সরকারি দায়িত্বের সময়ও বাইরে চলে যান। রোগী সংগ্রহের জন্য দালালরাও হাসপাতাল এলাকায় অপেক্ষায় থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নেতা ও নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বাইরে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখা ১৯৮২ সালের দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্সের ৪ নম্বর ধারার লঙ্ঘন। তার দাবি, এ ধরনের অনিয়মের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দালালের খপ্পরে সর্বস্ব হারানোর অভিযোগ চিকিৎসাপ্রার্থীদের
মুন্সিগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে মিটফোর্ড হাসপাতালে আসা ৭৫ বছর বয়সী আব্দুল মজিদের অভিজ্ঞতা এ ধরনের অভিযোগের একটি উদাহরণ। পিত্তথলিতে পাথর ও তলপেটে ব্যথার সমস্যা নিয়ে তিনি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন।
মজিদের ভাষ্য, বহির্বিভাগে টিকিটের লাইনে দাঁড়ানোর পর কয়েকজন ব্যক্তি তাকে কম খরচে দ্রুত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেন। তাদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি হাসপাতালের বাইরে একটি ক্লিনিকে যান। সেখানে যাওয়ার পর একের পর এক পরীক্ষা করানো হয়।
মজিদ অভিযোগ করেন, শারীরিক অবস্থা যাচাইয়ের কথা বলে তাকে বিভিন্ন প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়। এসব পরীক্ষার পেছনে তার কাছে থাকা সঞ্চয়ের শেষ অংশটুকুও খরচ হয়ে যায়। কিন্তু এত অর্থ ব্যয়ের পরও তিনি প্রত্যাশিত চিকিৎসা পাননি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মজিদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় এসেছিলেন। দালালদের কথায় বাইরে যাওয়ার পর পরীক্ষার নামে তার সব টাকা চলে গেছে। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফেরার ভাড়াটুকুও তার কাছে ছিল না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মজিদের মতো প্রতিদিন বহু রোগী ও স্বজন দালালদের মাধ্যমে হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চলে যান। সরকারি হাসপাতালে ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সেবা পাওয়ার জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে রোগীদের বাইরে পাঠানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দালালদের কমিশনভিত্তিক যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তাদের আরও অভিযোগ, রোগীদের দিয়ে অপ্রয়োজনীয় বা নিম্নমানের পরীক্ষা করিয়ে বড় অঙ্কের বিল আদায় করা হয়। হাসপাতালের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে দালালদের এমন তৎপরতা প্রকাশ্যেই চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তারা দালালচক্র ও অননুমোদিত ক্লিনিকের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এইচ এম এ রুস্তম বলেন, সরকারি কর্মঘণ্টায় কোনো চিকিৎসক বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালে দালালের তৎপরতা ও চুরির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেক সময় চোরেরা রোগীর স্বজন পরিচয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করায় তাদের শনাক্ত করতে আনসার সদস্যদের সমস্যায় পড়তে হয়। তারপরও নিয়মিত চোর আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগী ও স্বজনদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর