
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর কানাডার আরোপ করা নতুন শুল্ক মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের ব্যয় আরও বেড়েছে এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক বিরোধ নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে।
নতুন শুল্কের তালিকায় রয়েছে পোশাক, পনির, ধাতব যন্ত্রাংশ এবং কাঠজাত বিভিন্ন পণ্য। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ওয়াশিংটনের আরোপ করা শুল্কের জবাব হিসেবে এই পদক্ষেপ নেয় অটোয়া।
শুল্কের আওতায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য
কানাডার নতুন শুল্ক আপাতত দুই দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা নাও দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, যেসব মার্কিন পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেগুলোর পরিমাণ দুই দেশের মোট বার্ষিক বাণিজ্যের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ছোট।
তবে উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একে অপরের পণ্যের ওপর ধারাবাহিকভাবে পাল্টা শুল্ক বসাতে থাকলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে দুই দেশের ব্যবসা ও সাধারণ পরিবারের ওপর। বাড়তে পারে পণ্য ও ব্যবসা পরিচালনার খরচও।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত।
কানাডার কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো শুল্ক আরোপ করলে তার জবাবে কানাডা সমপরিমাণ শুল্ক বসাবে।
বাণিজ্য বন্ধের হুমকি ট্রাম্পের
কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়েও উপহাস করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা।
কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার তিনি এমন কথাও বলেছেন যে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারকেও সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কানাডার নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বোম্বার্ডিয়ারের আর কোনো বিমান বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।
একই পোস্টে মার্কিন ভোক্তাদের কানাডার কিছু পণ্য না কেনার আহ্বান জানান তিনি।
ট্রাম্পের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় বোম্বার্ডিয়ার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানশিল্প দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোর একটি।
প্রতিষ্ঠানটির ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসে ডানাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উড়োজাহাজ যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলেও জানিয়েছে বোম্বার্ডিয়ার।
ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিলের বাণিজ্য ও উদ্ভাবনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্র্যাড উড মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাল্টাপাল্টি শুল্ক দুই দেশের ব্যবসা ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
তিনি বলেন, নতুন শুল্ক দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যে আরও বড় বাধা তৈরি করছে।
কানাডার সঙ্গে চলমান বিরোধের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন আরও কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এসব দেশ অতিরিক্ত পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিস্থিতিকে ‘অতিরিক্ত সক্ষমতা’ হিসেবে বর্ণনা করছে। এর ফলে এসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য-ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
নতুন শুল্ক এ সপ্তাহের মধ্যেই কার্যকর হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপ করা কিছু শুল্ক বাতিল করে দেয়। এর পর সেগুলোর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবেও নতুন শুল্ক আরোপের পথ খুঁজছে ট্রাম্প প্রশাসন।
যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বেশি পণ্য রপ্তানি করে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলনামূলকভাবে কম পণ্য আমদানি করে, তাদের সঙ্গেও বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বাণিজ্য-ঘাটতি রয়েছে।
শুল্কের চাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ
শুল্ক আরোপের সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি করা পণ্যের দামে। আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে।
এ কারণে ট্রাম্পের বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলছে। চলতি সপ্তাহেই দেশটির নতুন ভোক্তা মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্যিক বিরোধ জুলাইয়ে প্রকাশ্যভাবে আরও তীব্র হয়। ওই সময় কানাডা মার্কিন শিল্পের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে বলে অভিযোগ করেন ট্রাম্প।
একই সঙ্গে ৩০ দিনের মধ্যে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে কানাডার কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি।
এরপর কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চললেও আগস্টে সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার ওয়াইন, পনির, পোশাক, হকি স্টিকসহ শত শত পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে।
এর জবাবে একই ধরনের মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক বসানোর ঘোষণা দেয় কানাডা।
নাম বদল নিয়ে নতুন বিরোধ
শুল্ক নিয়ে বিরোধের মধ্যেও দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমেনি। বরং কানাডার রাজনৈতিক নেতাদেরও নিয়মিত সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প।
এরই মধ্যে অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার জন্য একটি নির্বাহী আদেশও দিয়েছেন তিনি।
শুধু বাণিজ্য নয়, কানাডার মুদ্রা বিনিময় হার নিয়েও রোববার ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। মার্কিন ডলারের বিপরীতে কানাডীয় ডলারের বর্তমান ‘ভারসাম্যহীনতা’ আর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন তিনি।