
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডাসহ ১২টি দেশ ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির তদন্ত কমিশনের ভাষ্য, সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কিছু কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে বেসামরিক নাগরিকদের আটক এবং তাদের অন্যত্র স্থানান্তরের মতো পদক্ষেপ নিয়ে সতর্ক করেছে কমিশন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে সিরিয়া পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে এ কথা জানানো হয়।

সিরিয়া তদন্তকারী জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশনের কমিশনার ফিওনুয়ালা নি আওলাইন বলেন, দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এখন ‘ক্রমশই ধারাবাহিক ও সুপ্রতিষ্ঠিত’ হয়ে উঠছে।
তার ভাষ্য, ইসরায়েলি বাহিনীর বারবার স্থলপথে অনুপ্রবেশ, টহল, অভিযান ও তল্লাশির কারণে বেসামরিক নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
জেনেভায় অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
আসাদ সরকারের পতনের পর ইসরায়েলি তৎপরতা বৃদ্ধি
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর ইসরায়েলি সেনারা জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বাফার জোনে প্রবেশ করে।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ওই সময় বলা হয়েছিল, রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যবর্তী সময়ে নিজেদের সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সাময়িকভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
এরপর সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইসরায়েল শত শত হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়ার আরও ভেতরে নতুন সামরিক অবস্থানও দখল করেছে দেশটি।
সিরীয় সরকার ও জাতিসংঘের বক্তব্য, ইসরায়েলের এই সেনা মোতায়েন সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত সেনা প্রত্যাহার চুক্তিও এর মাধ্যমে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে তারা মনে করে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কুনেইত্রা ও দারায় সামরিক অবস্থান
সিরিয়া বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েল অস্থায়ী চেকপয়েন্ট এবং স্থায়ী সামরিক অবকাঠামো তৈরি করেছে—এমন তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ সিরিয়ার কুনেইত্রা ও দারা প্রদেশে ইসরায়েলি বাহিনীর এসব তৎপরতার তথ্য পেয়েছে কমিশন।
মানবাধিকার পরিষদে নি আওলাইন বলেন, ‘ইসরায়েলি লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতায় কমিশন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
তিনি জানান, সিরিয়ায় যখন পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে, সেই সময় ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ‘হতবাক’ হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
দুই শিশুসহ ৪৯ সিরীয়কে আটক
ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে সিরিয়ার নাগরিকদের আটকের বিষয়েও তদন্ত কমিশন তথ্য তুলে ধরেছে।
নি আওলাইন বলেন, জুন মাস পর্যন্ত কমিশন সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে আটক ৪৯ জন সিরীয়কে শনাক্ত করতে পেরেছে। তাদের মধ্যে দুইজন শিশু রয়েছে।
এই আটক ব্যক্তিদের সীমান্ত পার করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করছে কমিশন।
এ বিষয়ে নি আওলাইন বলেন, ‘এই ধরনের কাজ যুদ্ধাপরাধের সমান হতে পারে।’
কমিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। এর ফলে তাদের ওপর সম্ভাব্য নির্যাতন বা দুর্ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলি উপস্থিতিকে ‘আগ্রাসী দখলদারিত্ব’ বলছে কমিশন
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সিরিয়ার ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতিকে কমিশন একটি ‘আগ্রাসী দখলদারিত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামরিক অভিযান, আটক এবং স্থলভাগে ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতির কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব পড়ছে। একই সময়ে সিরিয়া পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সিরিয়ার প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছে সিরিয়ার প্রতিনিধি।
সিরীয় প্রতিনিধিদল ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং দেশটির সামরিক উপস্থিতিরও নিন্দা জানিয়েছে।
তাদের অভিযোগ, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। একই সঙ্গে ১৯৭৪ সালের সেনা প্রত্যাহার চুক্তি অমান্য করার জন্যও তারা ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।