
ফিলিস্তিনে ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটেনের সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরে করা একটি আইনি আবেদনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো জবাব দেয়নি যুক্তরাজ্য সরকার।
‘ব্রিটেন ওউজ প্যালেস্টাইন’ নামে একটি প্রচারাভিযানের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে ৪০০ পৃষ্ঠার ওই আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। আবেদনে ১৯১৭ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনামলে সংঘটিত বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ তুলে ধরা হয়।
আবেদন জমা দেওয়ার এক বছর পূর্ণ হওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর না আসায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
আবেদনে যাঁরা কাজ করেছেন
৪০০ পৃষ্ঠার নথিটির খসড়া তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবী বেন এমারসন ও ড্যানি ফ্রিডম্যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লাইম, অধ্যাপক জন কুইগলি এবং আইন বিশেষজ্ঞ ভিক্টর কাতান।
আবেদন জমা দেওয়ার বার্ষিকীটি এমন এক সময়ে পড়ছে, যখন ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য সরকারের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার এক বছর পূর্ণ হবে।
আবেদনে বলা হয়েছে, ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ফিলিস্তিনে ব্রিটেন যে বেআইনি আচরণ করেছিল, তার জন্য ব্রিটিশ সরকারের স্বীকারোক্তি ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া উচিত।
এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন সাবেক শ্যাডো চ্যান্সেলর জন ম্যাকডনেল, ব্রিটিশ-ফিলিস্তিনি এমপি লায়লা মোরান, লেখক রবার্ট ম্যাকফারলেন এবং অভিনেত্রী জুলিয়েট স্টিভেনসনসহ ৭৫ জন এমপি, পিয়ার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
বেলফোর ঘোষণা থেকে নাকবা
১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ‘ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি’-এর প্রতি ব্রিটেন সমর্থন প্রকাশ করে।
পরবর্তী সময়ে এই নীতির সঙ্গে ১৯৪৮ সালের নাকবা—অর্থাৎ সেই ‘মহাবিপর্যয়’-এর ঘটনাপ্রবাহের সম্পর্ক তৈরি হয়, যার ফলে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি তাঁদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হন। একই সময় ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথও প্রশস্ত হয়।
ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের ‘কোনো আইনি কর্তৃত্ব’ ছিল না
‘ব্রিটেন ওউজ প্যালেস্টাইন’-এর আবেদনে ১৯১৭ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যকার ব্রিটিশ কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রচারাভিযানটির দাবি, ওই সময় ব্রিটিশরা তৎকালীন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছিল।
‘মিডল ইস্ট আই’-এর সঙ্গে শেয়ার করা এক বিবৃতিতে প্রচারাভিযানটি বলেছে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য “আরবদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করেছিল এবং বেলফোর ঘোষণা জারি করার বা পরবর্তী ম্যান্ডেট শাসন করার কোনো আইনি কর্তৃত্ব তাদের ছিল না”।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ব্রিটিশ বাহিনী যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল। এসব অপরাধের মধ্যে হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক এবং ব্যাপকভাবে বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনাও ছিল।
প্রচারাভিযানটির যুক্তি, পশ্চিম তীর ও গাজায় বর্তমানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, বাড়িঘর ধ্বংস, আটক এবং বাস্তুচ্যুতির যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো সেই সময়ের ধারাবাহিকতা বলেই তারা মনে করে।
আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণের দাবি
নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক জন আইনের সহকারী অধ্যাপক ভিক্টর কাতান আবেদনটির সহ-খসড়াকারদের একজন। তিনি বলেন, “ব্রিটিশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনাই আমাদের প্রধান দাবি।”
আবেদনে এমন কিছু পর্যবেক্ষণও তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো সরকারের দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রচারাভিযানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই মাত্রার একটি দাবির ক্ষেত্রে যে ধরনের বিবেচনা পাওয়ার অধিকার আবেদনকারীদের রয়েছে, তাঁরা তার চেয়ে বেশি কিছু দাবি করেননি।
আবেদনকারীরা একটি যথাযথ ও যুক্তিসংগত জবাব পাওয়ার অধিকারী বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪৫ এমপি ও পিয়ারের খোলা চিঠি
আবেদন জমা দেওয়ার পর গত এক বছরে বিভিন্ন দলের ৪৫ জন এমপি ও পিয়ার এর সমর্থনে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
তাঁদের সঙ্গে ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনের ব্যক্তিরাও। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেত্রী জুলিয়েট স্টিভেনসন, লেখক রবার্ট ম্যাকফারলেন, লেখক ও কৌতুকাভিনেতা অ্যালেক্সেই সাইল এবং গায়িকা পালোমা ফেইথ।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে আরও সোচ্চার হচ্ছে—এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আবেদনটির জবাব দেওয়ার দাবি তুলেছে ‘ব্রিটেন ওউজ প্যালেস্টাইন’।
প্রচারাভিযানটি জানিয়েছে, এর মধ্যে চলতি মাসে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনার খবরও রয়েছে। একই সঙ্গে ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক বছর পূর্ণ হবে।
এ অবস্থায় সরকারকে এক বছর আগে জমা দেওয়া আবেদনের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রচারাভিযানটি।
‘ব্রিটেন ওউজ প্যালেস্টাইন’ বলেছে, “শান্তি প্রচেষ্টা ও পুনর্গঠনে ব্রিটেনকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হলে এই ক্ষমা প্রার্থনা হবে ন্যূনতম শর্ত।”
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই