
সম্প্রতি তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে গভীর রাতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার একটি ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেখে অনেকের ধারণা হয়েছিল, তিনি হয়তো কোনো হামলার মুখে পড়েছেন। তবে বাস্তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। পরে জানা যায়, এটি ছিল বার্ষিক ‘হান কুয়াং’ সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে পরিচালিত একটি জরুরি উদ্ধার মহড়া, যেখানে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তে সাঁজোয়া যানে করে অংশ নেন। যুদ্ধ বা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং সরকারের কার্যক্রম সচল রাখার সক্ষমতা যাচাই করতেই এই অনুশীলনের আয়োজন করা হয়।
গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে চীন। প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকিও দিয়ে আসছে বেইজিং। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীনের সম্ভাব্য সামরিক হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তাইওয়ানে গত বুধবার (৫ আগস্ট) থেকে ১০ দিনব্যাপী বার্ষিক ‘হান কুয়াং’ সামরিক মহড়া শুরু হয়েছে। আগামী ১৪ আগস্ট পর্যন্ত এ মহড়া চলবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বুধবার গভীর রাতে প্রেসিডেন্ট লাই এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদলকে একটি সামরিক কমান্ড সেন্টারে নেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিহিত প্রেসিডেন্ট একটি সাঁজোয়া যানে উঠছেন।
প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র কারেন কুও বিবৃতিতে বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সক্ষমতা যাচাই করতেই এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে সরকার যাতে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বজায় থাকে, সেটিও এই অনুশীলনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের ‘ওয়ান চুন’ পরিকল্পনা
২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের জন্য এ ধরনের সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়া এটিই প্রথম। সরকারের এই কৌশলগত মহড়ার নাম রাখা হয়েছে ‘ওয়ান চুন’, যার অর্থ ‘ভারী বোঝা’।
যুদ্ধ বা জরুরি সংকট দেখা দিলে তাইওয়ানের রাষ্ট্রপ্রধানকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার এই পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চিয়াং কাই-শেক তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মাও সেতুংয়ের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এই পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে চীনের গৃহযুদ্ধে মাওয়ের কমিউনিস্ট বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর চিয়াং কাই-শেক তাঁর অনুসারীদের নিয়ে তাইওয়ানে আশ্রয় নেন। পরে গণচীন প্রতিষ্ঠিত হলেও দুই পক্ষের মধ্যে এখনো কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতি হয়নি।
বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে তাইওয়ান। দেশটির দীর্ঘদিনের আশঙ্কা, যুদ্ধ শুরু হলে চীন প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে তথাকথিত ‘শিরশ্ছেদ মিশন’ পরিচালনা করতে পারে। ২০২৩ সালে তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক মহড়ার সময় দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও এমন ‘শিরশ্ছেদ মিশন’-এর অনুশীলনের কথা জানিয়েছিল।
ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও পরবর্তী প্রস্তুতি
চলমান সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে তাইওয়ানজুড়ে সেনা সদস্য ও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও রণকৌশলও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
গতকাল প্রেসিডেন্ট লাই কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংযুক্ত করার কাজ পরিদর্শন করেন। যুদ্ধকালীন দ্রুত আক্রমণের সক্ষমতা বাড়াতে ক্যাটামারান প্রযুক্তির ওই জাহাজে অস্ত্র সংযোজনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তাইপের সংশান বিমানবন্দর এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিকটবর্তী এলাকায় তাইওয়ানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘তিয়েন-কুং ৩’ সারফেস-টু-এয়ার (ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে সক্ষম।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধকালীন সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামনে রেখে এই মহড়া পরিচালিত হচ্ছে। এতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষা, উপকূলে সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ এবং যেকোনো সংকটে সাধারণ জনগণকে প্রস্তুত রাখার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মহড়ার অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে তাইওয়ানে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সম্ভাব্য চীনা হামলার সময় ব্যান্ডউইথ কমে গেলে জনগণ কীভাবে যোগাযোগ বজায় রাখবে, সেটি যাচাই করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিদিনই তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে চলমান মহড়া নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি বেইজিং। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবারও দ্বীপটির চারপাশে চীনের ১৪টি সামরিক বিমান এবং ৯টি যুদ্ধজাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে।
বেইজিং তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তেকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাঁর সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে লাইয়ের অবস্থান হলো, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল সে দেশের জনগণেরই।